খুলনা জেলা শহর থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে গিলাতলা ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে অত্যন্ত নিরাপদ ও সুরক্ষিত পরিবেশে বনবিলাস চিড়িয়াখানা (Bonobilash Zoo) গড়ে উঠেছে। ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে হওয়ায় এর ভেতরের পরিবেশ এবং গাছপালাগুলো ভীষণ পরিপাটি ও সুন্দরভাবে পরিচর্যা করা হয়।
শীতকালে বনবিলাস চিড়িয়াখানায় প্রচুর মানুষ পিকনিক বা বনভোজন করতে আসেন। পুরো দিন কাটানোর জন্য এখানে বসার ও খাওয়া-দাওয়ার সুন্দর ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এই চিড়িয়াখানার সাথেই যুক্ত রয়েছে জাহানাবাদ অ্যাডভেঞ্চার পার্ক । মাত্র ৮০ টাকা এন্ট্রি ফি দিয়ে এই পার্কে প্রবেশ করা যায়। এখানে বড়দের ও বাচ্চাদের জন্য হরেক রকমের রাইড রয়েছে। পার্কের ভেতরে একটি মিনি ওয়াটার পার্কও আছে। তাই বাচ্চাদের নিয়ে গেলে সাথে বাড়তি একজোড়া জামাকাপড় নিতে ভুলবেন না!
বনবিলাস চিড়িয়াখানার মূল আকর্ষণসমূহ
কংক্রিটের চার দেয়ালে বন্যপ্রাণীদের আটকে রাখা মনের কোণে কিছুটা খটকা জাগালেও, বিলুপ্তপ্রায় জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে প্রকৃতির বার্তা পৌঁছে দিতে চিড়িয়াখানার অবদান কিন্তু কম নয়। বনবিলাসের মূল ফটক গলে ভেতরে পা রাখতেই আপনার জন্য অপেক্ষা করছে দারুণ সব চমকঃ
হরেক পাখি ও চঞ্চল হনুমান: শুরুতেই আপনার নজর কাড়বে রঙিন সব পাখির কলকাকলি। আরেকটু এগোতেই দেখা পাবেন লম্বা লেজের দুই মুখপোড়া হনুমানের। এদের অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা আর দুষ্টুমি দেখতে খাঁচার সামনে সবসময় দর্শনার্থী, বিশেষ করে বাচ্চাদের জটলা লেগেই থাকে। এর ঠিক পাশেই বেশ গম্ভীর মুখে বসে থাকতে দেখা যায় দীর্ঘ ঠোঁটের পাখি ‘মদনটাক’-কে।
দুর্লভ ভোঁদড় ও সারস-কাকাতোয়া: আমাদের দেশের সাধারণ চিড়িয়াখানাগুলোতে ‘ভোঁদড়’ খুব একটা চোখে পড়ে না। তবে বনবিলাসের খামখেয়ালি আর চঞ্চল স্বভাবের ভোঁদড়গুলো আপনাকে হতাশ করবে না। এর পাশাপাশি ডানা মেলে দাঁড়িয়ে থাকা সারস এবং সুন্দর সুন্দর কাকাতোয়ার দেখা মিলবে এখানে।
অস্ট্রেলিয়ার ইমু ও কুঁড়ে ভাল্লুক: বিশাল আকৃতি দেখে অনেকেই একে উটপাখি ভেবে বসেন, তবে এটি আসলে অস্ট্রেলিয়ার আদি বাসিন্দা ‘ইমু পাখি’। ওজনে প্রায় ৪৫ কেজি পর্যন্ত হওয়া এই পাখিটির ঠিক পাশেই রয়েছে ‘এশীয় কালো ভাল্লুক’। দূর থেকে এদের ভীষণ শান্ত আর অলস মনে হলেও, আদতে কিন্তু এরা বেশ হিংস্র স্বভাবের মাংসাশী জীব।
বাঘ-হরিণের অদ্ভুত প্রতিবেশ: এই চিড়িয়াখানার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো বাঘের খাঁচা। তবে এর গায়ের হালকা ডোরাকাটা দাগ দেখে বোঝা যায়, এটি আমাদের সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার নয়, সম্ভবত ভারতের কোনো জঙ্গল থেকে আনা। মজার বিষয় হলো, বাঘের ঠিক লাগোয়া খাঁচাতেই রাখা হয়েছে হরিণদের। একপাশে বাঘ আয়েশ করে ঘুমাচ্ছে আর অন্যপাশে হরিণের দল মনের সুখে ঘাস খাচ্ছে—এমন চমৎকার বৈপরীত্যের দৃশ্য সত্যিই দেখার মতো!
বিশেষ আকর্ষণ: ডিমের মিউজিয়াম এবং ফিশ কর্নার বাঘের খাঁচার সামনে একটি কাঁচের বাক্সে সংরক্ষিত রয়েছে তিনটি বিশালাকার পাখির ডিম মদনটাক, উটপাখি এবং ইমু পাখির ডিম। এখান থেকে খুব সহজেই উটপাখি ও ইমু পাখির ডিমের আকারের পার্থক্য বোঝা যায়।
এছাড়াও চিড়িয়াখানার এক্সিট বা বের হওয়ার গেটের কাছে রয়েছে একটি ‘ফিশ অ্যান্ড স্নেক কর্নার’। এখানে বিভিন্ন সংরক্ষিত মাছ এবং সামুদ্রিক প্রাণীর দেখা মেলে। পাশেই রয়েছে একসময়ের জীবন্ত কিন্তু বর্তমানে মৃতাবস্থায় স্টাফ করে সংরক্ষিত একটি ‘চিতাবাঘ’।
প্রবেশ মূল্য ও সময়সূচী
ক্যান্টনমেন্টের প্রধান ফটক পেরিয়ে ডানদিকে একটু এগোলেই চোখে পড়বে চিড়িয়াখানার টিকিট কাউন্টার। টিকিট মূল্য জনপ্রতি মাত্র ৪০ টাকা। টিকিট কেটে ভেতরে ঢোকার পর একটি চমৎকার কাঠের তৈরি ব্রিজ পার হয়ে মূল চিড়িয়াখানায় প্রবেশ করতে হয়, যা শুরুতেই বেশ নান্দনিক একটা আবহ তৈরি করে।
কিভাবে যাবেন
খুলনা শহরের যেকোনো প্রান্ত (রূপসা, শিববাড়ী বা সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল) থেকে ইজি বাইক, সিএনজি বা লোকাল বাসে চড়ে সরাসরি গিলাতলা ক্যান্টনমেন্টের ‘বনবিলাস চিড়িয়াখানা’য় চলে আসা যায়। যাতায়াত ব্যবস্থা অত্যন্ত সহজ এবং সুগম।
আরও পড়ুনঃ ঢাকা থেকে খুলনা যাওয়ার বিস্তারিত উপায়
কোথায় খাবেন
চিড়িয়াখানা ও অ্যাডভেঞ্চার পার্কের ভেতরেই রয়েছে ফুড কোর্ট ও রেস্তোরাঁ। এখানে বিভিন্ন ফাস্টফুড আইটেম, চা, কফি খেতে পারবেন। এছাড়া ভালো মানের চাইনিজ, ইন্ডিয়ান বা প্রিমিয়াম ডাইনিংয়ের জন্য ফুলতলা বা খুলনা শহরের শিববাড়ী মোড় এলাকার রেস্টুরেন্ট গুলোতে গিয়ে খেতে পারেন।