আপনি কি কখনো ভেবেছেন, দুইশ বছর আগের নবাব-জমিদাররা ঠিক কোন পাত্রে খেতেন, কোন টেবিলে বসতেন, কিংবা কেমন গন্ধ ভাসত তাঁদের রান্নাঘর থেকে? পুরান ঢাকার বেচারাম দেউড়ির নূর বক্স লেনে ঢুকে একটা সরু গলি পেরোলেই আপনি সেই প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন বাস্তবে, থালা হাতে। এখানেই দাঁড়িয়ে আছে ইমরান’স হেরিটেজ হোম (Emran’s Heritage Home), যাকে স্থানীয়রা চেনেন “সাহেব বাড়ি” বা “জমিদার বাড়ি” নামে। বাইরে থেকে দেখলে এটা আর দশটা পুরনো বাড়ির মতোই সাধারণ কিন্তু গেট খুললেই আপনি সোজা হাঁটা দেবেন ইতিহাসের বইয়ের পাতায়।
এটা কোনো সাধারণ রেস্তোরাঁ নয়। এটা একটা পরিবার, যারা তাদের ২০০ বছরের বাড়ি, ৪০০ বছরের কোরআন শরিফ আর ছয় প্রজন্মের গল্প নিয়ে আপনাকে দুপুরের খাবারে আমন্ত্রণ জানায়।
ইতিহাসের শিকড় ও যেভাবে শুরু হয়েছিল এই জমিদারি
এই বাড়ির গল্প শুরু হয় প্রায় তিনশ বছর আগে। মুন্সি আলম নামের একজন ইসলাম প্রচারক ইয়েমেন থেকে মুঘল সম্রাটের আমলে এই উপমহাদেশে আসেন। তাঁর বংশধর মৌলভি আবুল খায়রাত মোহাম্মদ ঢাকা ও সোনারগাঁয়ের তৃতীয় প্রজন্মের জমিদার উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ছয় বিঘা জমির উপর তৈরি করেন এই বাড়ি, যার পুরনো নাম ছিল “ইউসুফ ক্যাসেল (Yousuf Castle)”।
এরপর জমিদারি চলে আসে তাঁর দুই ছেলে আবুল হাসনাত ও আবু জাফর জিয়াউল হক এর হাতে যাঁদের নামেই নামকরণ করা এই এলাকার সড়কগুলো (নূর বক্স লেন, আবুল হাসনাত রোড)। ষষ্ঠ প্রজন্মে এসে বাড়ির দায়িত্ব নেন এ এম ইমরান একজন অবসরপ্রাপ্ত বিমান পরিবহন কর্মকর্তা এর সাবেক সেলস ম্যানেজার। বাবার মৃত্যুর পর তাঁকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতেই ২০১৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তিনি চালু করেন “Lunch at Emran’s Heritage Home”।
আর্মেনিয়ান নিও-ক্লাসিক্যাল (Armenian Neo-Classical) স্থাপত্যরীতিতে গড়া এই বাড়ির ছাদ যেমন উঁচু, দরজা-জানালাও তেমন প্রশস্ত। আপনি ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়বে রঙিন কাচে মোড়া দরজা, তুরস্ক থেকে আনা দুটি ঝাড়বাতি, আর ৩০০ বছরের পুরনো এক তাসখেলার টেবিল, যা ভাঁজ করে গুটিয়ে ফেলা যায়।
জাদুঘরের এই বাড়িতে যা যা দেখবেন
গাইডেড ট্যুরে ইমরান সাহেব নিজেই আপনাকে ঘুরিয়ে দেখাবেন পরিবারের সংগ্রহঃ
৪০০ বছরের হাতে লেখা কোরআন শরিফ — সোনার প্রলেপ দেওয়া, আরবি ও ফার্সি দুই ভাষায় লেখা, স্বয়ং মুন্সি আলমের হাতে লেখা
দুইশ বছরের পুরনো “ওয়ার্মিং প্লেট” — যার কিনারায় ছিদ্র, গরম পানি ঢেলে খাবার উষ্ণ রাখার কৌশল
জং ধরা তলোয়ার, দুষ্প্রাপ্য হাতে লেখা বই, বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করা আতরদানি
২০০ বছরের টেলিস্কোপিক ডাইনিং টেবিল — যাতে বসেছিলেন যুক্তফ্রন্টের নেতারাও
ইমরান সাহেবের দাদা আবু জাফর জিয়াউল হক-এর আঁকা পেইন্টিং — যিনি আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারুকলায় স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন এবং ঢাকা নিউ মার্কেটের নকশাকার ছিলেন
আর যে সোফায় আপনি বসবেন সেটাও প্রায় ২০০ বছরের পুরনো। আর শিল্পী এস এম সুলতান (SM Sultan) এক মাসেরও বেশি সময় এই বাড়িতে ছিলেন, তাঁর ঘুমানোর খাটটিও আজও সংরক্ষিত আছে।
যাঁরা এই বাড়িতে খেয়েছেন
এই বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে জড়িয়ে আছে ইতিহাস আর কিংবদন্তিদের স্মৃতি। এখানে অতিথি হয়ে এসেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (একাধিকবার), নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু এবং বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। ১৯২৬ সালে এই বাড়ি থেকেই নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। এমনকি ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহও এই বাড়িতে খেয়েছেন, আর তাঁর অন্যতম প্রিয় খাবার ছিল এই পরিবারের বিশেষ পদ “মোতানজেল”।
ইমরান’স হেরিটেজ হোমের খাবারের তালিকা
ইমরান সাহেবের স্ত্রী ও তিন বোন নিজেদের হাতে রান্না করেন প্রতিটি পদ। কোনো বাণিজ্যিক বাবুর্চি নয়, পারিবারিক রেসিপি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে।
জাফরানি পোলাও (Zafrani Pulao) — জাফরান দিয়ে রান্না সুগন্ধি পোলাও
ডিমের শাহি কোরমা (Dimer Shahi Korma) — মিষ্টি দইয়ের সসে ডিমের ঘন কোরমা
মুরগির চপ (Murgir Chop) — মুরগি ও আলুর মিশ্রণে তৈরি ভাজা পদ
মোরগ খানা (Morog Khana) — ঘি, মালাই ও জাফরান দিয়ে রান্না মুরগির পোলাও
চিংড়ি মালাই (Chingri Malai) — নারকেলের দুধে রান্না চিংড়ি
বোরহানি (Borhani) — পুদিনা ও ধনেপাতার ঘরোয়া টক দইয়ের পানীয়
মিষ্টান্নে জর্দা (Zarda) — দুধ, চিনি ও এলাচ দিয়ে রান্না মিষ্টি পোলাও
আগে থেকে অর্ডার দিলে পাবেন আনারস ইলিশ (Anarash Ilish), দোলমা (Dolma) ও কোফতা (Kofta)-র মতো বিশেষ পদও। একসময় পরিবারের রান্নাঘরে তৈরি হতো কিংবদন্তি পদ “সুবদেগ”।
বুকিং ও খরচ
একক পরিবার বা ছোট গ্রুপের জন্য: ৪-৫ ঘণ্টা আগে জানালেই চলে
বড় গ্রুপের জন্য: ২-৩ দিন আগে বুকিং দিতে হয়
অতিথি সংখ্যা: সর্বনিম্ন ৫-৬ জন, সর্বোচ্চ ২০-৩০ জন পর্যন্ত
বুকিং মাধ্যম: ফেসবুক পেজ অথবা সরাসরি ফোনে
মোটামুটিভাবে ৯০০ থেকে ১৩০০ টাকার মধ্যেই দুটি প্যাকেজ পাওয়া যায় (সাত বছরের নিচের শিশুদের জন্য চার্জ প্রযোজ্য নয়)। যেহেতু এটা কোনো ফিক্সড-মেনু রেস্তোরাঁ নয়, তাই বুকিংয়ের সময় সরাসরি ফোনে বর্তমান দাম ও প্যাকেজ নিশ্চিত করে নেওয়াই ভালো।
এটা প্রথাগত কোন রেস্তোরাঁ নয় প্রতিদিন মেনু বদলায়, আর ইমরান সাহেব নিজে হাতে খাবার পরিবেশন করেন। তাই ধৈর্য নিয়ে যান, তাড়াহুড়ো করবেন না।
যোগাযোগ ইমরান’স হেরিটেজ হোম ৮/১ নূর বক্স রোড, বেচারাম দেউড়ি, ঢাকা মোবাইলঃ 01711-646462 ই-মেইলঃ gf.emran@gmail.com Website | Facebook Page
কিভাবে যাবেন
ঢাকার যেকোন যায়গা থেকে পুরান ঢাকাগামী যেকোনো বাসে চড়ে নেমে যেতে পারেন সদরঘাট বা চকবাজার এলাকায়, এরপর রিকশা বা হেঁটে বেচারাম দেউড়ি। এছারা রাইড-শেয়ারিং সার্ভিস দিয়ে সরাসরি “নূর বক্স লেন, বেচারাম দেউড়ি” ঠিকানায় পৌঁছানো সবচেয়ে সহজ। পুরান ঢাকার সরু গলিতে গাড়ি নিয়ে ঢোকা কঠিন। বড় রাস্তায় গাড়ি পার্ক করে রিকশায় বা হেঁটে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।