জেলা প্রশাসকের হাতি ‘ফুলকলি’র সমাধিসৌধ (Elephent Fulkoli Mausoleum) খাগড়াছড়ি শহরে প্রবেশের মুখেই গোলবাড়ি এলাকায় অবস্থিত একটি স্থাপনা। পাহাড়ঘেরা সবুজ প্রাকৃতিক পরিবেশের মাঝে অবস্থিত এই স্মৃতিসৌধ শুধু একটি হাতির কবর নয়, এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের এক সময়ের যোগাযোগব্যবস্থা, প্রশাসনিক ইতিহাস এবং মানুষের সঙ্গে প্রাণীর আবেগঘন সম্পর্কের প্রতীক।
আজকের উন্নত সড়কব্যবস্থা ও যানবাহনের আগে, পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা ছিল অত্যন্ত কঠিন। ১৯৬২ সালে যখন খাগড়াছড়ি ছিল একটি মহকুমা, তখন তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক হাবিবুল ইসলাম প্রশাসনিক যাতায়াতের জন্য একটি পোষা হাতি নিয়ে আসেন রামগড় থেকে। সেই হাতিটির নাম দেওয়া হয় ‘ফুলকলি’। পরবর্তী প্রায় তিন দশক ১৯৬২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ফুলকলি খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
ফুলকলির পিঠে চড়ে জেলা ও মহকুমা প্রশাসকেরা প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলে দাপ্তরিক কাজ করতেন। স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসের রাষ্ট্রীয় কুচকাওয়াজে অংশ নেওয়া থেকে শুরু করে পাহাড়ি পথে দুর্ঘটনায় পড়া যানবাহন উদ্ধার সবখানেই ছিল ফুলকলির অবদান। ধীরে ধীরে ফুলকলি হয়ে ওঠে খাগড়াছড়িবাসীর আবেগ, ভালোবাসা ও স্মৃতির অংশ।
১৯৯০ সালের ২৭ জুলাই, আলুটিলা পাহাড় এলাকায় দুর্ঘটনায় পড়ে ফুলকলির মৃত্যু হয়। তৎকালীন জেলা প্রশাসক খোরশেদ আনসার খান পরম মমতায় তাকে খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম সড়কের পাশে সমাধিস্থ করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই কবর অবহেলায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়লেও, সাম্প্রতিক সময়ে জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাসের উদ্যোগে এটি নতুন রূপ পায়। আজ ফুলকলির সমাধিসৌধ খাগড়াছড়ির অন্যতম ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় পর্যটন স্থানে পরিণত হয়েছে।
কিভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি যাওয়ার সবচেয়ে প্রচলিত ও সুবিধাজনক উপায় হলো বাসে যাত্রা করা। ঢাকার সায়েদাবাদ, কলাবাগান বা গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন খাগড়াছড়িগামী নন-এসি ও এসি বাস ছেড়ে যায়। সড়কপথে সাধারণত সময় লাগে ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা, ভাড়া পড়তে পারে আনুমানিক ৭৫০ থেকে ১,২০০ টাকা। যারা ট্রেনে ভ্রমণ করতে চান, তারা ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ট্রেনে গিয়ে সেখান থেকে বাস খাগড়াছড়ি যেতে পারেন।
খাগড়াছড়ি শহরে পৌঁছানোর পর ফুলকলির সমাধিসৌধে যেতে আলাদা কোনো ঝামেলা নেই। এটি জেলা শহরের প্রবেশমুখে, খাগড়াছড়ি–চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে অবস্থিত এবং শহর থেকে দূরত্ব মাত্র আধা কিলোমিটার। সিএনজি অটোরিকশা, রিকশা বা হেঁটেই সহজে সেখানে যাওয়া যায়। সিএনজিতে ভাড়া সাধারণত ২০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যেই থাকে।
কোথায় থাকবেন
ফুলকলির সমাধিসৌধ যেহেতু খাগড়াছড়ি শহরের কাছেই অবস্থিত, তাই শহর এলাকায় থাকাই ভ্রমণকারীদের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক। খাগড়াছড়িতে পর্যটন মোটেল, হোটেল ইকো ছড়ি ইন, শৈল সুবর্ন, হোটেল হিল টাচ, হোটেল মাউন্ট ইন, হোটেল নূর, গাংচিল আবাসিক ও অরণ্য বিলাসের মতো ভালমানের আবাসিক হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। এছারাও খাগড়াছড়ি শহরে বেশ কিছু সাধারণ মানের হোটেল ও গেস্টহাউস রয়েছে, যেখানে ৮০০ থেকে ১,৫০০ টাকার মধ্যে রাতে থাকতে পারবেন।
কোথায় খাবেন
খাগড়াছড়ির শাপলা চত্বর, বাস স্ট্যান্ড ও পান্থাই পাড়ায় কয়েকটি খাবারের রেস্টুরেন্ট আছে। খাগড়াছড়ির সিস্টেম রেস্তোরা, পেডা টিং টিং, গাং সাবারং, পাজন ও চিম্বাল রেস্টুরেন্টের খাবার বেশ জনপ্রিয়। সুযোগ থাকলে অবশ্যই খাগড়াছড়ির জনপ্রিয় হাঁসের কালাভুনা, বাশকুড়ুল সহ ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ী খাবারের স্বাদ নিতে ভুলবেন না।