গজনী অবকাশ কেন্দ্র শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। শেরপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে এবং ঢাকা থেকে প্রায় ২২০ কিলোমিটার উত্তরে এর অবস্থান। ভারত সীমান্ত সংলগ্ন গারো পাহাড়ের চূড়া ও ঢালে প্রায় ৯০ একর এলাকা জুড়ে এই অবকাশ কেন্দ্রটি বিস্তৃত। প্রকৃতিপ্রেমীদের মনে গজনীর সারি সারি গজারী, শাল ও সেগুন গাছ প্রশান্তি এনে দেয়। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি সময়টি গজনী অবকাশ কেন্দ্র ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। এ সময় আবহাওয়া তুলনামূলক শীতল থাকে এবং গারো পাহাড়ের চারপাশে সবুজ পরিবেশ ও কুয়াশাচ্ছন্ন দৃশ্য বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। পাহাড়ি ঝরণা, লেক, টিলা, ছড়ার স্বচ্ছ জল ও ঘন সবুজ বন এখানকার পরিবেশকে দিয়েছে এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
গজনী অবকাশ কেন্দ্রে পাহাড়ি ঝরণার গতিপথে বাঁধ দিয়ে একটি কৃত্রিম লেক তৈরি করা হয়েছে। লেকের মাঝে সৃষ্টি করা হয়েছে কৃত্রিম পাহাড় ও ‘লেক ভিউ পেন্টাগন’, যা একটি দোদুল্যমান ব্রিজ দিয়ে সংযুক্ত। গারো পাহাড়ের চূড়ায় ৬ কক্ষবিশিষ্ট একটি আধুনিক রেস্টহাউস রয়েছে। রেস্টহাউস থেকে পাহাড়ের পাদদেশে যাওয়ার জন্য রয়েছে ‘পদ্মাসিঁড়ি’ নামক একটি আঁকাবাঁকা সিঁড়িপথ। এছাড়া গজনী অবকাশ কেন্দ্রে রয়েছে পর্যাপ্ত কার পার্কিংয়ের ব্যবস্থা ও খেলার মাঠ। পিকনিক করার জন্য এখানে বিশুদ্ধ পানির নলকূপ, পর্যাপ্ত স্যানিটেশন এবং রান্নার সুব্যবস্থা রয়েছে।
গজনী অবকাশ কেন্দ্রে যা যা দেখবেন
গজনী অবকাশ কেন্দ্রে যাওয়ার পথে রাংটিয়া নামক স্থানে পর্যটন কেন্দ্রটির একটি পূর্ণাঙ্গ ম্যাপ দেখা যায়। রাংটিয়া বাজার থেকে গজনী অবকাশ কেন্দ্রের আঁকাবাঁকা পথটি ঘন গজারী, শাল ও সেগুন গাছের ছায়ায় ঢাকা, যা পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
এখানে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো সুউচ্চ সাইড ভিউ ওয়াচ টাওয়ার। এই টাওয়ার থেকে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের উঁচুনিচু পাহাড়ি টিলা, সবুজের সমারোহ এবং ভাগ্য ভালো থাকলে সীমান্তের বন্য হাতির পদচারণাও দেখা যায়। এটি পর্যটকদের পুরো অবকাশ কেন্দ্রের একটি ৩৬০ ডিগ্রি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ দেয়। এছাড়া এখানে সম্প্রতি লেকের ওপর নতুন আকর্ষণ হিসেবে একটি দৃষ্টিনন্দন ভাসমান সেতু স্থাপন করা হয়েছে।
অন্যান্য আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম লেক ও ঝুলন্ত ব্রিজ (যা মূল কেন্দ্রের সাথে ডাইনোসর পাহাড়কে সংযুক্ত করেছে), মিনি চিড়িয়াখানা, ক্যাকটাস পল্লী, শিশু পার্ক, রংধনু ব্রীজ, ক্রিন্সেন্ট লেক, কৃত্রিম জলপ্রপাত (আলোকের ঝরণাধারা), পাতাল পথ, লাভলেইন এবং বিভিন্ন প্রানীর প্রতিকৃতি। রোমাঞ্চপ্রিয়দের জন্য এখানে রয়েছে ক্যাবল কার এবং জিপার কার বা জিপলাইন রাইড। আদিবাসী সংস্কৃতি দেখার জন্য এখানে রয়েছে ‘আদিবাসী পল্লী’, যেখানে বিভিন্ন ভাস্কর্যের মাধ্যমে গারোদের ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
প্রবেশ ফি
প্রবেশ ফি ও বিভিন্ন রাইডের খরচ সময়ভেদে পরিবর্তিত হতে পারে। ভ্রমণের আগে স্থানীয় প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য যাচাই করা ভালো। সর্বশেষ হালনাগাদ অনুযায়ী জনপ্রতি প্রবেশ ফি ২০ টাকা এবং ওয়াচ টাওয়ারের টিকেট মূল্য জনপ্রতি ২০ টাকা। ভাসমান সেতু ও লেক ভ্রমণ ২০০ টাকা। গজনী অবকাশ কেন্দ্রে গাড়ী নিয়ে প্রবেশ করতে হলে উপজেলা পরিষদ চেকপোষ্ট থেকে গেটপাস নিতে হয়। বাস ও ট্রাকের জন্য ৩০০ টাকা, মাইক্রোবাস, পিকআপ ও মেক্সি ১৫০ টাকা, জিপ, প্রাইভেট কার ১০০ টাকা এবং সিএনজির প্রবেশের জন্য ৫০ টাকা প্রদান করে গেটপাস নিতে হয়। এই গেটপাস সংরক্ষণ করুন কারণ সীমান্তে বিজিবির নকশী ক্যাম্পে গেটপাস দেখাতে হয়। এছাড়াও পার্ক এবং বিভিন্ন রাইডে চড়তে রাইডভেদে ৫ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত লাগবে।
গজনী অবকাশ কেন্দ্র যাওয়ার উপায়
ঢাকা থেকে গজনী অবকাশ কেন্দ্রে যেতে ময়মনসিংহ হয়ে যাতায়াত করা সবচেয়ে সুবিধাজনক। ঢাকার মহাখালি বাস স্ট্যান্ড থেকে ড্রিমল্যান্ড স্পেশাল বাসে করে শেরপুর আসতে জনপ্রতি ৫০০ টাকা ভাড়া লাগবে। তবে মহাখালী থেকে দুপুর ২ টায় শেরপুর যাবার এসি বাস পাবেন, এসি বাসের ভাড়া জনপ্রতি ৬০০ টাকা।
শেরপুর বাসস্ট্যান্ড হতে জনপ্রতি ১০ টাকা অটো রিক্সা ভাড়ায় খোয়ারপাড় শাপলা চত্বর আসতে হবে। শাপলা চত্বরে গজনী-মধুটিলা যাওয়া অটো/সিএনজি রিজার্ভ পাওয়া যায়। সারাদিনের জন্য গজনী ও মধুটিলা ইকোপার্ক ঘুরে আসার অটো ভাড়া ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। প্রতি অটোতে ৬/৭ জন উঠা যায়।
শেরপুর থেকে মাইক্রোবাস যোগে গজনী অবকাশ কেন্দ্রে যেতে খরচ হবে ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা। এছাড়া শেরপুর থেকে লোকাল বাসে করে ঝিনাইগাতী উপজেলায় এসে আবার সেখান থেকে বাস, সিএনজি অথবা রিক্সায় গজনী অবকাশ কেন্দ্রে সহজে যেতে পারবেন।
উত্তরবঙ্গ থেকে গজনী অবকাশ কেন্দ্রে যেতে হলে রেল বা সড়ক পথে জামালপুর হয়েও শেরপুর আসতে পারেন। শেরপুর থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরত্বে গজনী অবকাশ কেন্দ্র অবস্থিত।
কোথায় থাকবেন
ঝিনাইগাতীতে উপজেলা ডাকবাংলো এবং বনবিভাগের একটি রেস্ট হাউজ আছে। এগুলোতে পূর্ব অনুমতি নিয়ে থাকতে পারবেন। শেরপুর জেলায় ১৫০ থেকে ৫০০ টাকায় সাধারণ মানের গেষ্ট হাউজের পাশাপাশি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় হোটেল সম্পদ, কাকলী, বর্ণালী গেষ্ট হাউজ, ভবানী প্লাজা নামের বেশকিছু মাঝারি মানের হোটেল রয়েছে। শেরপুরে সড়ক ও জনপথ, সার্কিট হাউজ, এলজিইডি, এটিআই এবং পল্লী বিদ্যুৎ এর পৃথক পৃথক রেষ্ট হাউজ রয়েছে। গজনী অবকাশ কেন্দ্রের রেস্ট হাউসের থাকতে হলে সময় ভেদে প্রতিটি কক্ষের জন্য ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা ভাড়া দিতে হতে পারে।
ফোন নাম্বারঃ সার্কিট হাউজ – ০৯৩১-৬১৫১৩, হোটেল সম্পদ – ০১৭১৮-২৯০৪৪৭, কাকলী গেষ্ট হাউজ – ০১৯১৪৮৫৪৪৫০, হোটেল সাইদ – ০৯৩১-৬১৭৭৬।
কোথায় খাবেন
গজনী এলাকায় খাবারের বিকল্প সীমিত হওয়ায় দুপুরের খাবারের জন্য ঝিনাইগাতী উপজেলা সদর বা শেরপুর শহর বেশি সুবিধাজনক। সেখানে স্থানীয় বাংলা খাবার, ভাত, মাছ, মাংস এবং হালকা নাস্তার ব্যবস্থা পাওয়া যায়। ঝিনাইগাতীতে হোটেল সাইদ ও হোটেল জোসনায় খাবার খেতে পারেন। আর শেরপুর খাবার খেতে চাইলে নিউ মার্কেট এলাকায় হোটেল শাহজাহান, হোটেল আহার এবং হোটেল প্রিন্সে যেতে পারেন।
পরামর্শ
গজনী অবকাশ কেন্দ্র ভারত সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় নির্ধারিত পর্যটন এলাকা ছাড়া সীমান্তসংলগ্ন অঞ্চলে না যাওয়াই নিরাপদ। সীমান্ত এলাকায় বিজিবির নিরাপত্তা বিধিনিষেধ অনুসরণ করা উচিত। জরুরী প্রয়োজনে শেরপুর জেলা প্রশাসকের নেজারত শাখায় ফোন করতে পারেন। ফোন নাম্বারঃ ০১৭৩৭২৯৪৮৪৯, ০১৭৪০৬০২৪১১