হাওড় জনপদের লঞ্চ বিলাস: ভাটির দেশের স্বপ্নযাত্রা
ছোটবেলা থেকেই অনেকের মনে ভাটির দেশ দেখার এক অদম্য স্বপ্ন থাকে। সেই স্বপ্নকে আরও উস্কে দেয় যখন জানা যায় ভৈরব থেকে লঞ্চে করে সরাসরি সুনামগঞ্জ যাওয়া সম্ভব। বহু বছরের অপেক্ষার পর, অবশেষে ২০২২ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি সেই স্বপ্নপূরণের দিনটি আসে। তেজগাঁও থেকে তিতাস কমিউটার ট্রেনে চেপে ভৈরব যাত্রা শুরু হয়। ভৈরব পৌঁছে সোজা লঞ্চ ঘাটে।
রাতের লঞ্চ যাত্রা: ভৈরব থেকে সাচনা
ভৈরব থেকে প্রতিদিন রাত ১১টায় মিঠামইন, ইটনা হয়ে সুনামগঞ্জের সাচনা পর্যন্ত এবং আজমিরীগঞ্জ হয়ে হবিগঞ্জের মার্কুলীর উদ্দেশ্যে লঞ্চ ছেড়ে যায়। মার্কুলীর লঞ্চ রাত ৩টা এবং সকাল ১১টায়ও পাওয়া যায়। তবে সাচনার লঞ্চ একটাই, যা রাত ১১টায় ছাড়ে। এই লঞ্চগুলো মূলত ছোট দ্বিতল, যেখানে নিচতলায় যাত্রীদের বসার জন্য বেঞ্চ এবং উপরতলায় সাধারণ মানের কেবিন থাকে। রাতের লঞ্চগুলো মালামাল পরিবহনে বেশি ব্যস্ত থাকে। একসময় এই রুটে যাত্রীচাপ সামলাতে হিমশিম খেলেও, বর্তমানে মাল পরিবহনই লঞ্চগুলোকে টিকিয়ে রেখেছে।
পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে আজমেরি-মার্কুলি যাওয়া হয়েছিল, তাই এবার লং রুটের আকর্ষণেই সাচনা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ভৈরব থেকে সাচনা যেতে প্রায় ১৬ ঘণ্টা সময় লাগে এবং উন্মুক্ত ডেকের ভাড়া মাত্র ২৩০ টাকা। ভাটির দেশের লঞ্চগুলো সময়ানুবর্তিতার জন্য বিখ্যাত। ঠিক ১১টায় লঞ্চ ছাড়ার পর একে একে আশুগঞ্জ, মিঠামইন, ইটনা, খালিয়াজুড়ি পাড়ি দিয়ে পরদিন বিকেল ৩টার পর সাচনা বাজারে পৌঁছানো যায়। ভাটির দেশের অপার সৌন্দর্যে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলাম যে, পুরো রাত নির্ঘুম চোখে, হাড় কাঁপানো ঠান্ডাতেও বাইরে উন্মুক্ত স্থানে বসে ছিলাম। যদিও সেই আফসোস এখনো মেটেনি, আবার যাওয়ার অপেক্ষায় আছি। 🐸
সাচনায় পৌঁছে হাঁস-ভুনা আর গরম ভাত দিয়ে পেটপুরে খাওয়ার পর, জনপ্রতি ৬০ টাকা দরে সিএনজি যোগে সুনামগঞ্জ পুরাতন বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছানো হয়।
সুনামগঞ্জ থেকে মোহনগঞ্জ: আরেক লঞ্চ যাত্রা
সুনামগঞ্জ থেকে পরবর্তী গন্তব্য মোহনগঞ্জ, এবং সেখানেও লঞ্চ যাত্রা। এই লঞ্চটিও ছাড়ে রাত ১১টায়। হাতে সময় থাকায়, হাসন রাজার জাদুঘর এক পলক দেখে নেওয়া হয় এবং পানসীতে দুপুরের খাবার সেরে নেওয়া হয়। রাত ১১টায় "প্রিন্স অব লক্ষীপুর" লঞ্চে ওঠা হয়, যা পূর্বের ভরা মৌসুমে ধর্মপাশা থেকে সুনামগঞ্জ যাত্রার সঙ্গী ছিল। এই যাত্রার ভাড়া ছিল ১৩৫ টাকা। 💔
রাতটা আধো ঘুমে কাটিয়ে ভোরে ধর্মপাশার মেউহারি ঘাটে নামা হয়। সেখান থেকে মিশুক যোগে জনপ্রতি ৫০ টাকায় মোহনগঞ্জ রেলস্টেশনে পৌঁছানো হয়। সেখানে সকালের নাস্তা সেরে, ৩০ টাকায় লোকাল ট্রেনে করে ময়মনসিংহ পৌঁছানো হয়। সারাদিন ময়মনসিংহ শহরে ঘোরার পর, ক্ষুধা, ঘুম আর ক্লান্তি নিয়ে মাসকান্দা এসে এনা বাসে উঠে আবার কোলাহলপূর্ণ যান্ত্রিক শহরে ফেরা।
হাওড়ের পরিবেশ ও ভ্রমণ টিপস
হাওড় জনপদে এখনো দূষণের প্রভাব তেমনভাবে লাগেনি। তাই দয়া করে নিজেরা দূষণের কারণ হয়ে হাওড়ের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে হুমকিতে ফেলবেন না। মনে রাখবেন, দেশ আমাদের, একে পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্বও আমাদের। 🇧🇩
ভ্রমণের সেরা সময়: শীতকাল (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) হাওড় ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এই সময় আবহাওয়া ঠান্ডা থাকে এবং চারপাশের প্রকৃতি সবুজ ও সতেজ থাকে।
কী কী সাথে নেবেন: হালকা গরম কাপড়, ছাতা বা রেইনকোট (বর্ষাকালে), মশা তাড়ানোর স্প্রে, পাওয়ার ব্যাংক, টর্চলাইট, ব্যক্তিগত ঔষধপত্র, এবং অবশ্যই ক্যামেরা।
সতর্কতা:
- রাতের লঞ্চে মালামাল বেশি থাকে, তাই নিজের জিনিসপত্রের খেয়াল রাখুন।
- হাওড়ের আবহাওয়া হঠাৎ পরিবর্তন হতে পারে, তাই সতর্ক থাকুন।
- স্থানীয় সংস্কৃতি ও পরিবেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন।
- প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।