চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তরে এবং ফটিকছড়ি উপজেলা সদর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে রামগড়-সীতাকুণ্ড বনাঞ্চলের মাঝে প্রায় ৩,০০০ একর (১১৭৭ হেক্টর) জায়গা জুড়ে অবস্থিত হাজারিখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য (Hazarikhil Wildlife Sanctuary)। বিরল প্রজাতির বৃক্ষ ও প্রাণীর নির নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে ২০১০ সালের ৬ এপ্রিল এই বনাঞ্চলকে আনুষ্ঠানিকভাবে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
হাজারিখিল অভয়ারণ্যে বর্তমানে প্রায় ২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ১৫০ এর বেশি প্রজাতির পাখি, ৮ প্রজাতির উভচর, ২৫ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ২৫০ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। উল্লেখযোগ্য বন্যপ্রাণীর মধ্যে আছে বানর, হনুমান, মায়া হরিণ, বনবিড়াল, মেছো বাঘ, বনরুই এবং বিরল প্রজাতির অজগর। পাখি প্রেমীদের জন্য এটি এক স্বর্গরাজ্য। এখানে দেখা মেলে হুদহুদ, নীলকান্ত, গ্রেট সিলেটি উডপেকার (কালিকাঠ ঠোকরা), মাছরাঙা, বেঘবৌ, আবাবিল, কাউ ধনেশ, বুলবুল এবং সানবার্ডের। শীতকালে পরিযায়ী পাখিদের কলকাকলিতে এই অভয়ারণ্য আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে।
হাজারিখিল অভয়ারণ্যের শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশে ক্যাম্পিং করার পাশাপাশি চা বাগানের রোমাঞ্চকর পরিবেশে ট্রি অ্যাক্টিভিটিসে অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। অভয়ারণ্যের সাধারণ প্রবেশ ফি জনপ্রতি ২৫ টাকা ও বন্যপ্রাণীর ট্রি এক্টিভিটিসের এন্ট্রি ফি ১৫০ টাকা জনপ্রতি। এছাড়া প্রকৃতির মায়াময় রূপ দেখতে চাইলে ঘুরে দেখতে পারেন প্রায় ৭০ বছরের পুরনো এবং ২,৬৪০ একর জুড়ে বিস্তৃত রাঙ্গাপানি চা বাগান। দুঃসাহসিক ট্র্যাকারদের জন্য রয়েছে ঝিরিপথ ও পাহাড়ের ভেতর দিয়ে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ট্রেইল, যা সহস্রধারা ঝর্ণা ২ এবং কালাপানি ঝর্ণাকে সংযুক্ত করেছে।
কিভাবে যাবেন
হাজারিখিল অভয়ারণ্যে যাওয়ার দুটি জনপ্রিয় রুট রয়েছে। প্রথমটি ফটিকছড়ি রুট: চট্টগ্রাম শহর থেকে বাসে ফটিকছড়ি এসে সিএনজি নিয়ে ১৩ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত হাজারিখিল অভয়ারণ্যে পৌঁছানো যায়। দ্বিতীয়টি হল সীতাকুণ্ড রুট (ট্রেকিং প্রেমীদের জন্য): ঢাকা থেকে বাসে সীতাকুণ্ডের ছোট দারোগার হাট নেমে গাইড নিয়ে ট্রেকিং শুরু করা যায়। এই পথে ২০ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে রয়েছে ২০০ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক গফুর শাহ গায়েব মসজিদ এবং সূর্যকুণ্ড (বা সূর্যমুনি) মন্দির। এরপর সহস্রধারা ঝরণা-২ হয়ে দীর্ঘ ঝিরিপথ পেরিয়ে হাজারিখিল পৌঁছানো যায়।
আরও পড়ুনঃ ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার বিস্তারিত উপায়
কোথায় থাকবেন
হাজারিখিল অভয়ারণ্যে বন বিভাগের অনুমতি সাপেক্ষে ক্যাম্পিং করার সুযোগ আছে। রাতে ক্যাম্পিং করার জন্য আগে থেকে ফরেস্ট পারমিশন এবং একজন নিরাপত্তারক্ষী (গার্ড) সাথে রাখা বাধ্যতামূলক। যারা ক্যাম্পিং করতে চান না, তারা চট্টগ্রাম শহরের জিইসি মোড়, স্টেশন রোড বা আগ্রাবাদ এলাকার হোটেল স্টার পার্ক, হোটেল ডায়মন্ড পার্ক বা এশিয়ান এসআর হোটেলে থাকতে পারেন।
কোথায় খাবেন
হাজারিখিল অভয়ারণ্যের পাশেই হাজারিখিল বাজার (লালাবাজার) অবস্থিত। এখানে স্থানীয় ভাতঘর গুলোতে দুপুরের খাবার সেরে নিতে পারেন। ক্যাম্পিং করলে রাতে বারবিকিউ করতে পারবেন। এছাড়া সুযোগ থাকলে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজবানি মাংস ও কালা ভুনা অবশ্যই ট্রাই করবেন।
হাজারিখিল ভ্রমণ পরামর্শ
ট্রেকিং বা ট্রি অ্যাডভেঞ্চারের পরিকল্পনা থাকলে দিনের আলো থাকতেই যাত্রা শুরু করুন।
বনের ভেতর রাতে ক্যাম্পিং করতে হলে অবশ্যই গাইড এবং বন বিভাগের নির্ধারিত গার্ড সাথে নিন।
হাজারিখিল ট্রেইল এবং ঝিরিপথ অত্যন্ত পিচ্ছিল, তাই ভালো গ্রিপের জুতা ব্যবহার করুন।
জোঁকের উপদ্রব থেকে বাঁচতে লবণ বা সরিষার তেল সাথে রাখুন।
বনের নিস্তব্ধতা বজায় রাখুন এবং প্লাস্টিক বা বর্জ্য ফেলে পরিবেশ দূষিত করবেন না।
চট্টগ্রামের অন্যান্য দর্শনীয় স্থান চট্টগ্রামের অন্যান্য দর্শনীয় স্থানের মধ্যে কমনওয়েলথ ওয়ার সিমেট্রি , ফয়েজ লেক , মহামায়া লেক , জাম্বুরি পার্ক , চন্দ্রনাথ পাহাড় এবং মীরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ঝরণা উল্লেখযোগ্য।