চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাকে বলা হয় আমের রাজধানী। আর সেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাটে বসে বাংলাদেশের বৃহত্তম আমের বাজার। শুধু দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি আমবাজারই নয়, কানসাট একই সঙ্গে এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম আমবাজার হিসেবেও পরিচিত। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সদর থেকে প্রায় ২৩ কিলোমিটার দূরে শিবগঞ্জ উপজেলায় এর অবস্থান। প্রতি আমের মৌসুমে দেশের এই বৃহৎ আম বাজারে প্রায় শত কোটি টাকার উপরে আমের বেচাকেনা হয়। কোনো কোনো দিনে বাজারে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার আম কেনাবেচা হয়। আমের সময়ে প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জমে থাকে এই আমবাজার। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে অনেক আমের বাজার থাকলেও কানসাট আমের বাজার পাইকারি বাজারের জন্যে সবচেয়ে বড় এবং বিখ্যাত। এ যেন এক আমের রাজ্য। আমবাজার ঘুরে দেখার সাথে সাথে আপনি চাইলে কিনে খেতে পারবেন নানা রকম তরতাজা পাকা আম। এছাড়া ঝুড়িভর্তি করে আম কিনে নিতে পারবেন নিজের জন্যে।
যাওয়ার উপযুক্ত সময়
আম পরিপক্ক হবার পর থেকেই মূলত এই বাজারে আম আসা শুরু করে। সাধারণত মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত কানসাট বাজার আমে ভরে থাকে। মূলত জুন মাসের পুরো সময় সবচেয়ে বেশি জমজমাট থাকে। এই সময় বাজারে ফজলি, আম্রপালি, বারি-৪, আশ্বিনাসহ নানা জাতের আমের সমারোহ দেখা যায়। শিবগঞ্জ উপজেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটা বড় অংশ আবর্তিত হয় আম ও আমবাগানকে কেন্দ্র করে। মে মাস থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত আমকে কেন্দ্র করে সমগ্র শিবগঞ্জ যেন বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় জেগে ওঠে।
কানসাটে আসতে চাইলে জুনের প্রথম থেকে মাঝামাঝি সময়টাই সবচেয়ে আদর্শ। এই সময় বাজারে চাঁপাইনবাবগঞ্জের জিআই (GI) স্বীকৃতি পাওয়া পণ্য ক্ষীরশাপাতি আম সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় এবং দামও তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকে।
আমবাজারে কী কী দেখবেন
কানসাটের বিখ্যাত আমবাজারে আম মৌসুমে উপজেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে নানা জাতের আম কেনাবেচা হয়। বাজারে ক্ষীরশাপাতি, ল্যাংড়া, আম্রপালি, লক্ষ্মণভোগ, গুটি এবং ব্যানানা ফ্রুটসহ নানা জাতের আম দেখা যায়। প্রতিটি বাজারে কয়েক মাসের জন্য গড়ে ওঠে আমের আড়ত। এই আড়তের মালিক ও ব্যবসায়ীরা আম কিনে পাঠিয়ে দেন দেশের বিভিন্ন স্থানে। বাজারে ঢোকার আগে শিবগঞ্জ-সোনামসজিদ সড়কে আমবোঝাই ব্যাটারিচালিত ভ্যান ও ভটভটির দীর্ঘ সারি চোখে পড়বে। বাজারে এলে শুধু আম কেনাবেচার দৃশ্যই নয়, চাষি, আড়তদার আর ব্যবসায়ীদের সরগরম আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে এই এলাকার মানুষের জীবিকার গল্পটাও চোখে পড়বে।
আজকাল অনেক ব্যবসায়ী কানসাট থেকে আম কিনে অনলাইনে সারা বাংলাদেশে হোম ডেলিভারি দিচ্ছেন। তাই কানসাটে না আসতে পারলেও ঘরে বসে অর্ডার করে এই বাজারের তাজা আম পাওয়ার সুযোগ আছে।
আম বাজার যাওয়ার উপায়
চাঁপাই নবাবগঞ্জ যাবার সহজ উপায় বাসে করে যাওয়া। ঢাকার কল্যানপুর ও গাবতলী থেকে দেশ ট্রাভেলস, ন্যশনাল ট্রাভেলস, গ্রামীন ট্রাভেলস, তুহিন এলিট এর এসি ও নন এসি বাস সরাসরি চাঁপাইনবাবগঞ্জ যায়। এসি/নন এসি এসব বাসের ভাড়া মানভেদে ৮৩০-১৫০০ টাকা। এসব বাসে আপনি সরাসরি কানসাট চলে যেতে পারবেন অথবা চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে নেমে সেখান থেকে ২১ কিলোমিটার দূরের কানসাটে অন্য কোন লোকাল বাহনে যেতে পারবেন।
এছাড়া কমলাপুর রেলওয়ে ষ্টেশন থেকে বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনে করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় যাওয়া যায়। আসনভেদে ভাড়া লাগবে ৫১৫ থেকে ১১৭৩ টাকা। তবে একদিনের ভ্রমণ করতে চাইলে সরাসরি বাসে যাওয়াই ভালো। সেক্ষেত্রে আগের দিন রাতে রওনা হয়ে পরিদিন সকালে পৌঁছে যাবেন, সারাদিন ঘুরে সন্ধ্যার বাসে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হতে পারবেন।
থাকবেন কোথায়
আপনার যদি রাতে থাকার প্রয়োজন হয় সেইক্ষেত্রে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহরে থাকার জন্যে মোটামুটি মানের বেশকিছু হোটেল আছে। উল্লেখযোগ্য হোটেলের মধ্যে রয়েছে হোটেল রোজ, হোটেল আল নাহিদ, হোটেল স্বপ্নপুরী, নবাবগঞ্জ বোডিং এবং হোটেল রংধনু। তবে পরিবেশ তেমন ভাল না। ভালো কোথাও থাকতে চাইলে আপনার রাজশাহী শহরে চলে আসতে হবে। রাজশাহী শহরে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মোটেলে ১৯০০ থেকে ৪৬০০ টাকায় বিভিন্ন মানের রুম পাবেন। অন্যান্য আবাসিক হোটেলের মধ্যে হোটেল হক্স ইন, নাইস ইন্টারন্যাশনাল, মুক্তা ইন্টারন্যাশনাল, ডালাস ইন্টারন্যাশনাল শুকরান ইত্যাদি হোটেলে ৫০০ থেকে ৩০০০ টাকায় রুম পাবেন।
আশেপাশের দর্শনীয় স্থান
আম বাজারের পাশাপাশি সেখানে বিভিন্ন আম বাগানে ঘুরে দেখতে পারবেন। চাইলে বাগান থেকেও নিজ হাতে পেরে আম কিনে নিতে পারবেন। এছাড়া হাতে সময় থাকলে কানসাটের কাছেই কানসাট জমিদার বাড় ও ছোট সোনা মসজিদ ঘুরে দেখতে পারেন। আরও আছে নাচোল উপজেলার আলপনা গ্রাম টিকইল । এছাড়া রাজশাহীতে গেলে সেখানে কী কী দেখতে পারবেন তার বিস্তারিত পড়ুন রাজশাহী ভ্রমণ গাইডে।