দিনাজপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তরে কাহারোল উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নে অবস্থিত কান্তনগর প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর (Kantanagar Archaeological Museum) উত্তরবঙ্গের এক সমৃদ্ধ সংগ্রহশালা। দিনাজপুর-পঞ্চগড় মহাসড়কের পাশেই ঢেপা নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই জাদুঘরটি মূলত বাংলার প্রাচীন সভ্যতা ও রাজকীয় ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। কান্তজিউ মন্দিরের ঠিক পাশেই এর অবস্থান হওয়ায় পর্যটকদের জন্য এটি ইতিহাসের কাছাকাছি যাওয়ার এক চমৎকার সুযোগ করে দেয়।
এই জাদুঘরের প্রধান আকর্ষণ হলো এর দুর্লভ কষ্টিপাথরের মূর্তিগুলো, যা উচ্চতায় ১ ফুট থেকে ১০ ফুট এবং ওজনে ৫ কেজি থেকে ৮৫০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। ঐতিহাসিক তথ্যানুসারে, হাজার বছর আগে ভারতের রাজমহল পাহাড়ের বিশেষ ধরনের পাথর দিয়ে এই দেবমূর্তিগুলো নির্মাণ করা হতো। তবে ১২ শতকের পর সেই পাহাড়টি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় এই বিশেষ পাথরটি এখন আর পাওয়া যায় না। বর্তমানে কষ্টিপাথরের মূর্তি তৈরি করা প্রায় অসম্ভব হওয়ায় এই প্রাচীন নিদর্শনগুলোর ঐতিহাসিক ও আর্থিক মূল্য যেমন অপরিসীম, তেমনি এগুলো আমাদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের এক দুষ্পাপ্য স্মারক হিসেবে টিকে আছে।
কান্তজিউ মন্দির দেখতে গেলে ফেরার পথে হাতে কিছুটা সময় রাখুন। কারণ এই জাদুঘরটি না দেখলে বাংলার প্রাচীন ধর্মীয় শিল্প ও হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের এক বিশাল অংশ অজানাই থেকে যাবে।
কান্তনগর প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরে কি দেখবেন
কান্তনগর প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরে প্রবেশ করতেই প্রথমে দর্শনার্থীদের নজর কাড়বে তেভাগা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত ‘সিদু কানু চত্বর’, যা এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের এক অনন্য স্মারক। জাদুঘরের মূল ভবনের দেয়ালজুড়ে থাকা শৈল্পিক টেরাকোটা অলংকরণ পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা মিলবে উত্তরবঙ্গের প্রাচীন ঐতিহ্যের এক বিশাল সম্ভার। এর সংগ্রহশালায় অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো রয়েছে কয়েকশ বছর আগের রাজকীয় ও মুঘল আমলের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, প্রাচীনকালের দুষ্পাপ্য সোনা ও রুপার মুদ্রা এবং তৎকালীন মানুষের ব্যবহৃত নানা প্রাচীন উপকরণ ও কারুকার্যময় শিল্পকর্ম।
জাদুঘরটির গ্যালারিতে পা রাখলে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করবে বিভিন্ন দেব-দেবীর সারি সারি সাজানো কষ্টিপাথরের মূর্তিগুলো। ১ ফুট থেকে শুরু করে ১০ ফুট উচ্চতার এই মূর্তিগুলো যেন ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এছাড়াও এখানে প্রাচীন বাংলার ধর্মীয় শিল্প ও হারিয়ে যাওয়া সময়ের নানা বাস্তব প্রমাণ প্রদর্শিত রয়েছে। মূলত বাংলার প্রাচীন ইতিহাস ও রাজকীয় জীবনধারাকে খুব কাছ থেকে দেখার জন্য এই জাদুঘরটি একটি সমৃদ্ধ প্রদর্শনী কেন্দ্র।
প্রবেশ টিকিট মূল্য ও সময়সূচি
কান্তনগর প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরে জনপ্রতি প্রবেশমূল্য মাত্র ২০ টাকা। সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা দর্শনার্থীদের জন্য এই জাদুঘর খোলা থাকে। রবিবার এবং অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনে জাদুঘরটি বন্ধ থাকে।
কিভাবে যাবেন
ঢাকার গাবতলী, কল্যাণপুর, আসাদ গেট বা উত্তরা থেকে সরাসরি দিনাজপুরের বাস পাওয়া যায়। নন-এসি এবং এসি বাস ভাড়া মানভেদে ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকা। বাসে করে সরাসরি দিনাজপুর শহরে আসতে পারেন। অথবা আপনি যদি পঞ্চগড়গামী বাসে উঠেন, তবে সরাসরি কান্তনগর মোড়ে নেমে যেতে পারেন, যা জাদুঘরের অনেক কাছে।
ঢাকার কমলাপুর কিংবা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে আন্তঃনগর একতা এক্সপ্রেস, দ্রুতযান এক্সপ্রেস, ও পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেন দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। শ্রেনীভেদে এইসব ট্রেনের টিকেটের মূল্য ৬৩০ টাকা থেকে ২,২১৮ টাকা লাগবে।
দিনাজপুর শহর থেকে সিএনজি, অটো বা বাসে চড়ে পঞ্চগড় মহাসড়ক ধরে উত্তরে প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে কাহারোল উপজেলার কান্তনগর মোড়ে নামতে হবে। কান্তনগর মোড় থেকে ঢেপা নদীর ওপর নির্মিত কান্তনগর ব্রিজ পার হলেই জাদুঘর প্রাঙ্গণে পৌঁছে যাবেন। এটি কান্তজিউ মন্দিরের পাশেই অবস্থিত।
কোথায় থাকবেন
কান্তনগর প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর ও কান্তজিউ মন্দিরের পাশেই প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি রেস্ট হাউস রয়েছে। তবে সবসময় এটি সাধারণ পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত থাকে না। আগে থেকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া বা ঢাকা) থেকে লিখিত অনুমতি বা বুকিং নিতে হয়। সরাসরি গিয়ে সেখানে রুম পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
রাতে থাকতে চাইলে সবচেয়ে ভালো উপায় হলো দিনাজপুর শহরে ফিরে আসা। দিনাজপুর শহরে ভাল মানের হোটেলে থাকতে চাইলে পর্যটন মোটেলে থাকতে পারেন। এছারা হোটেল ডায়মন্ড, নিউ হোটেল, হোটেল আল রশিদ, হোটেল রেহানা, হোটেল নবীন ইত্যাদিতে ৫০০ থেকে ১,৮০০ টাকায় রাত্রি যাপন করতে পারবেন।
কোথায় খাবেন
খাওয়ার জন্য কান্তনগর জাদুঘরের আশেপাশেই সাধারণ মানের বেশ কিছু হোটেল রয়েছে। এখানে ভাত, মাছ ও ভর্তার মতো ঘরোয়া খাবার পাওয়া যায়। একটু ভালো মানের রেস্টুরেন্ট চাইলে ৫-১০ মিনিট দূরত্বে কান্তনগর মোড় বা মহাসড়কের পাশের হাইওয়ে হোটেলগুলোতে যেতে পারেন। এছাড়া খাবারের জন্য দিনাজপুর শহরে ফিরে যাওয়াই সবচেয়ে ভালো। স্থানীয় ঐতিহ্যের স্বাদ নিতে দিনাজপুরের বিখ্যাত দই-চিড়া ট্রাই করতে ভুলবেন না।