প্রকৃতির এক অপার বিস্ময় আর রোমাঞ্চের নাম বান্দরবান । কির্সতং (Kristong) পাহাড় বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় চিম্বুক রেঞ্জের সর্বোচ্চ চূড়ায় অবস্থিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এই পাহাড়ের উচ্চতা প্রায় ২,৯০০ ফুট। ‘কির্সতং’ শব্দটি মারমা ভাষা থেকে এসেছে। ‘কির্স’ মানে একটি বিলুপ্তপ্রায় পাখি এবং ‘তং’ মানে পাহাড়। একসময় এই পাহাড়ের চূড়ায় এই বিরল পাখিগুলো দেখা যেত বলে এর এমন নামকরণ করা হয়েছে। এছারাও এই পাহাড় একসময় ধনেশ পাখির আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত ছিল। ঘন অরণ্যে ঘেরা এই পাহাড়ে এখনও অনেক দুর্লভ পশুপাখির দেখা মেলে। ঘন জঙ্গল, শতবর্ষী বিশাল সব গাছ আর বন্যপরিবেশ কির্সতংকে অন্য সব পাহাড় থেকে আলাদা করেছে। এখানে পৌঁছানোর পথ যেমন দুর্গম, তেমনই রোমাঞ্চকর।
পাহাড়ি ম্রো উপজাতিদের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি আর সহজ-সরল জীবনযাপন এই যাত্রায় এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। বিশেষ করে খেমচং পাড়া থেকে কির্সতং চূড়ার পথে যে রহস্যময় কুয়াশাচ্ছন্ন জঙ্গল পড়ে, তা পর্যটকদের এক ভৌতিক ও মায়াবী অনুভূতি দেয়। নগর জীবনের যান্ত্রিকতা ভুলে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেতে এবং মেঘের রাজ্যে হারিয়ে যেতে কির্সতং অভিযানের কোনো বিকল্প নেই। তবে মনে রাখবেন, এটি কোনো সাধারণ ভ্রমণ নয়। এটি এক দুঃসাহসিক অভিযান যেখানে শারীরিক সক্ষমতা আর ধৈর্যই আপনার প্রধান সঙ্গী।
কখন যাবেন কির্সতং ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো শীতকাল (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি)। তবে যারা পাহাড়ে মেঘের খেলা আর বৃষ্টির মায়াবী রূপ দেখতে চান, তারা বর্ষার শেষের দিকে যেতে পারেন। বৃষ্টির সময় পাহাড়ি পথ অত্যন্ত পিচ্ছিল থাকে এবং জোকের উপদ্রব বহুগুণ বেড়ে যায়।
কিভাবে যাবেন
কির্সতং পাহাড়ে যেতে হলে প্রথমে আপনাকে বান্দরবানের আলীকদমে পৌঁছাতে হবে। ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে হানিফ ও শ্যামলী পরিবহনের বাস সরাসরি আলীকদমে যায়। বাস ভাড়া লাগবে জনপ্রতি ১,১০০ টাকা। আবার চাইলে ঢাকা থেকে প্রথমে বাসে চকরিয়া গিয়ে সেখান থেকে লোকাল বাসে ১০০ টাকা ভাড়ায় আলীকদম যেতে পারেন।
আরও পড়ুনঃ ঢাকা থেকে বান্দরবান যাওয়ার উপায়
আলীকদম থেকে ২১ কিলো আলীকদম বাস স্ট্যান্ড থেকে অটোতে ১০ টাকা ভাড়ায় পানবাজার যেতে হবে। পানবাজার থেকে মোটরসাইকেলে জনপ্রতি ৩০০ টাকা ভাড়ায় ২১ কিলো নামক স্থানে নামতে হবে।
২১ কিলো থেকে কির্সতং পাহাড় ২১ কিলো থেকে তিন্দুর রাস্তা ধরে ৫-৬ ঘণ্টা হাঁটার পর আপনি পৌঁছাবেন বেসক্যাম্প খেমচং পাড়ায়। পরদিন এই পাড়া থেকে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা ট্রেকিং করে কির্সতং পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছাতে পারবেন।
কোথায় থাকবেন
খেমচং পাড়ায় পর্যটকদের মূলত আদিবাসীদের ঘরে থাকতে হয়। বাঁশ এবং কাঠের তৈরি ঐতিহ্যবাহী মাচাং ঘরে এখানে থাকার ব্যবস্থা খুবই সাধারণ।
কোথায় খাবেন
পাহাড়ি পাড়াতে আদিবাসীদের ঘরেই খাবারের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। তবে এ জন্য গাইডকে আগেই বলে রাখতে হয়। ভাত, পাহাড়ি মুরগি, আলু ভর্তা ও ডাল হলো এখানকার প্রধান মেন্যু। আর ট্রেকিংয়ের সময় সাথে শুকনা খাবার সাথে রাখুন।
পরামর্শ
অনুমতি ও গাইড: রুমা বাজারে পৌঁছে অবশ্যই আর্মি ক্যাম্পে জাতীয় পরিচয় পত্র সহ রিপোর্ট করতে হবে এবং একজন রেজিস্টার্ড গাইড সাথে নিতে হবে। গাইড ছাড়া এই পথে যাওয়া সম্ভব নয়।
শারীরিক সক্ষমতা: এটি একটি মাঝারি থেকে কঠিন লেভেলের ট্রেকিং, তাই শারীরিকভাবে ফিট থাকা প্রয়োজন।
প্রয়োজনীয় জিনিস: ভালো গ্রিপের ট্রেকিং জুতা, বাঁশের লাঠি, ফার্স্ট এইড কিট এবং ওডোমস (মশা থেকে বাঁচতে) সাথে রাখুন।
পরিবেশ রক্ষা: পাহাড়ে কোনো প্রকার প্লাস্টিক বা ময়লা ফেলবেন না। প্রকৃতির ক্ষতি হয় এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন।
পাওয়ার ব্যাংক: পাহাড়ে বিদ্যুৎ সুবিধা না থাকায় পর্যাপ্ত চার্জসহ পাওয়ার ব্যাংক সাথে নিন।