প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বান্দরবান। পাহাড়ি এই জেলায় ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ছোট-বড় ঝর্ণা, আর প্রতিটি ঝর্ণার সৌন্দর্যই ভিন্নরকম। এর মধ্যে অন্যতম লাংলোক ঝর্ণা (Langlok Waterfall) , যা স্থানীয়ভাবে লিলুক ঝর্ণা নামেও পরিচিত। অ্যাডভেঞ্চার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী এর উচ্চতা প্রায় ৩৯৩ ফুট । অনেকের মতে, এটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু ঝর্ণা। বান্দরবানের থানচি উপজেলার তিন্দু ইউনিয়নে অবস্থিত এই ঝর্ণাটি এখন অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য।
মূলত লাংলোক ঝিরি থেকেই এই জলপ্রপাতের সৃষ্টি। স্থানীয় মারমা/খুমি ভাষায় ‘লাংলোক’ মানে বাদুড়। ঝর্ণার কাছে ঝিরির পাশে বাদুর গুহা রয়েছে। এই বাদুড় গুহার কারণে স্থানীয়রা ঝিরিকে লাংলোক ঝিরি নামে ডাকে। আর এই ঝিরির জলপ্রপাত তথা ঝর্ণার নাম হয়েছে লাংলোক ঝর্ণা। নিকটবর্তী খুমী পাড়ার মানুষেরা ঝর্ণার দেয়ালে বসবাসরত ফিঞ্চ প্রজাতির মত পাখির নামানুসারে এই ঝর্নাকে ফি ফি ক্লে বলে অভিহিত করেন। চিম্বুক পর্বতশ্রেণী থেকে ঝিরিটি উৎপত্তি হয়ে লাংলোক জলপ্রপাত হয়ে সাঙ্গু নদীতে মিশেছে।
লাংলোক যাবার উপযুক্ত সময়
লাংলোকে মূলত বর্ষাকালেই পানির প্রবাহ বেশী থাকে। শুকনো সময়ে পানি একেবারে কমে যায়। অনেক সময় একেবারে শুকনো থাকে। তবে বৃষ্টি হলে বেশি পানির দেখা মিলে। লাংলোকের আসল সৌন্দর্য দেখতে হলে আপনাকে বর্ষা ও তার পরবর্তী সময়ে যেতে হবে। লাংলোক ভ্রমণের সবচেয়ে বেস্ট সময় জুন থেকে অক্টোবর মাস।
লাংলোক যাওয়ার উপায়
লাংলোক যাবার জন্যে দুইটি পথ পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। একটি হচ্ছে বান্দরবান সদর থেকে থানচি উপজেলা হয়ে যাবার আরেকটি হচ্ছে বান্দরবানের আলিকদম উপজেলা থেকে থানচি হয়ে যাবার। আবার অনেকেই আলিকদম থেকে থানচি না গিয়ে আলিকদম-থানচি রোডের ২১কিলো দিয়ে তিন্দু হয়ে লাংলোক যায়।
শুধু লাংলোক ঘুরে দেখতে চাইলে থানচি থেকে দিনে দিনে ঘুরে ফিরে আসা যায়। থানচি থেকে ছোট ইঞ্জিন নৌকা নিয়ে যেতে হবে বাঘেরমুখ পাড়া। যেতে সময় লাগবে প্রায় ১ ঘন্টা। শুষ্ক মৌসুমে সময় কিছু বেশি সময় লাগতে পারে। নৌকা ভাড়া যাওয়া আসা মিলিয়ে ৩০০০-৩৫০০ টাকা লাগবে। এক নৌকায় ৫ জন বসতে পারবেন। যাওয়ার পথে তিন্দু ও রাজা পাথর বড় পাথর এলাকা পথে পরবে।
বাঘেরমুখ পাড়া থেকে প্রায় ৫০ মিনিট ট্রেকিং করেলেই দেখা মিলবে লাংলোক ঝর্ণার। যেহেতু পাহাড়ি পথে উঠতে হবে তাই কারও জন্যে সময় একটু বেশি লাগতে পারে।
চারিদিক ঘন জঙ্গলে ঘেরা উচুঁ নিচু আঁকা বাঁকা পথ ও পিচ্ছল পাথর পেরিয়ে লাংলোক বা লিলুক ঝর্ণার সামনে গেলে মুগ্ধ হয়ে ভুলে যাবেন দূর্গম পথের সকল ক্লান্তি। যদি ভাগ্য ভালো থাকে, আর যদি ঝর্ণায় অনেক পানির দেখা পান, তবে অবশ্যই আজীবন মনে রাখার মত স্মৃতি নিয়ে ফিরবেন আপনি।
তিন্দু হয়ে যেতে চাইলে তিন্দু পাড়া থেকে সাঙ্গু নদীর পাশ দিয়ে হেটেই যাওয়া যাবে বাঘেরমুখ পাড়ায়, যেতে সময় লাগবে প্রায় ১ঘন্টা। তারপর আগের মত ট্রেকিং করতে হবে। চাইলে তিন্দু পাড়া থেকে নৌকা নিয়ে বাঘেরমুখ পাড়ায় যেতে পারবেন। যাওয়া ও আসার জন্যে ভাড়া লাগবে প্রায় ১০০০-১৫০০ টাকা।
গাইড
থানচি কিংবা তিন্দু হয়ে যেভাবেই যান আপনাকে গাইড নিতে হবে। থানচি বাজারেই গাইড পাবেন। তিন্দু হয়ে গেলে পাড়া থেকে স্থানীয় কাউকে নিয়ে যেতে হবে। এক দিনের জন্যে গাইড ৮০০-১০০০ টাকা লাগতে পারে। গাইড পার্মিশন ও নৌকা ভাড়ার জন্যে সাহায্য করবে। প্রয়োজনে আগেই কোন পুর্ব পরিচিত গাইডের নাম্বারে কথা বলে ঠিক করে রাখতে পারেন।
কোথায় থাকবেন
যদি রাতে থাকার দরকার হয় তাহলে তিন্দু পাড়া কিংবা বাঘেরমুখ পাড়ায় আদিবাসীদের ঘরে থাকতে পারবেন। এছাড়া থানচি বাজারে বেশ কয়েকটি মোটামুটি মানের কটেজ ও বিজিবি রিসোর্ট আছে থাকার জন্যে।
খাবেন কোথায়
আদীবাসী পাড়া গুলোতে আগে থেকে বলে রাখলে খাবারে ব্যবস্থা করে রাখবে। এছাড়া পাড়া গুলোতে ছোট দোকানে চা নাস্তা করার সুযোগ আছে। ভালো কিছু খেতে চাইলে থানচি বাজারে ব্রিজের কাছে বেশ কিছু মোটামুটি মানের খাবারের হোটেল আছে।
ট্যুর প্ল্যান
লাংলোক ছাড়াও আশেপাশে বেশ কিছু স্থান আছে যা ২দিনে ঘুরে দেখা যায়। যাত্রাপথেই তিন্দু, বড় পাথর এলাকা, কুমারী ঝর্ণা দেখে নিতে পারেন। এছাড়া আছে রেমাক্রি, নাফাখুম , আমিয়াখুম সহ আরও স্থান। থানচি থেকে কাছেই আছে তমা তুঙ্গী পর্যটন স্পট ও ডিম পাহাড় । আপনি কতদিনের জন্যে যাবেন, কিভাবে যাবেন এইসব বিবেচনা নিয়ে একটু ট্যুর পরিকল্পনা করে নিলে ভালো হবে।
ভ্রমণ টিপস
বর্ষায় সাঙ্গু উত্তাল থাকে, নৌকা ভাড়ার করার সময় লাইফজ্যাকেট নিয়ে নিন।
ট্রেকিং এর পথ পিচ্ছিল, ভালো গ্রিপের ট্রেকিং স্যান্ডেল নিন।
ব্যাগ যত হাল্কা রাখা যায় তত ভালো।
ঝর্ণার নিচে যাবার সময় সতর্ক ও সাবধান থাকুন। বেশি পানি থাকলে নিচে যাবার চেষ্টা করবেন না।
ঝর্ণার কাছে যাবার পথে বেশ বড় বোল্ডার/পাথর আছে। এই গুলো বেশ পিচ্ছিল। সাবধানে হাটবেন।
যে কোন ধরণের ঝুকি নেওয়া থেকে বিরত থাকবেন।
থানচিতে রবি/এয়ারটেলের নেটওয়ার্ক পাবেন। তবে ভিতরে গেলে তাও পাবেন না।
পাড়া গুলোতে বিদ্যুত নেই, সোলার একমাত্র ভরসা। সাথে পাওয়ার ব্যাংক নিন।
অতিরিক্ত গরম থেকে বাচতে সানগ্লাস, ক্যাপ, গামছা ব্যবহার করুন।
সাথে করে অবশ্যই জাতীয় পরিচয় পত্রের কয়েকটা কপি নিতে হবে।
যে কোন বিষয়ে গাইডের সাথে কথা বলুন।
এমন কোন আচরণ করবেন না যেন স্থানীয় মানুষজনের বিরক্তির কারণ হয়।
যে কোন ধরণের ময়লা বা প্লাস্টিক পথে বা ঝর্ণার কাছে ফেলবেন না।