পুঠিয়া রাজবাড়ী (Puthia Rajbari) বাংলাদেশের রাজশাহী জেলায় অবস্থিত নজরকাড়া ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্যের একটি অনন্য ঐতিহাসিক নিদর্শন। রাজশাহী বিভাগীয় শহর হতে মাত্র ৩০ কিলোমিটার এবং রাজশাহী-নাটোর মহাসড়ক থেকে মাত্র ১ কিলোমিটার দূরে পুঠিয়া রাজবাড়ীর অবস্থান। বহুকক্ষ বিশিষ্ট এই দৃষ্টিনন্দন দ্বিতল পুঠিয়া রাজবাড়ীতে প্রবেশের জন্য উত্তর দিকে একটি বিশাল ও রাজকীয় সিংহ দরজা রয়েছে। তৎকালীন লস্করপুর পরগনার জমিদার বা রাজারা এখান থেকে তাদের রাজকার্য ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। উনবিংশ শতাব্দীতে নির্মিত পুঠিয়া রাজবাড়িটি বর্তমানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষিত রয়েছে, যা একসময় লস্করপুর ডিগ্রী কলেজ হিসেবেও সাময়িকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
পুঠিয়া রাজবাড়ী পরিবেষ্টিত পরিখাগুলোর রয়েছে আলাদা আলাদা ঐতিহাসিক নাম। শিব সরোবর বা শিবসাগর, মরাচৌকি, বেকিচৌকি,গোপালচৌকি ও গোবিন্দ সরোবর পরিখা ছাড়াও রাজবাড়ী প্রাঙ্গণে ‘শ্যামসাগর’ নামে একটি বিশাল দিঘি বা পুকুর রয়েছে। দুটি রাজপ্রাসাদ এবং তৎকালীন জমিদারদের নির্মিত বেশ কয়েকটি টেরাকোটা ও পাথরের প্রাচীন মন্দির এখনো এখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। এদের মধ্যে অন্যতম দোচালা পদ্ধতিতে নির্মিত বড় আহ্নিক মন্দির, ১৮২৩ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম বড় শিব মন্দির বা ভুবনেশ্বর মন্দির, চারতলা বিশিষ্ট পুঠিয়া দোল মন্দির এবং পুঠিয়া পাঁচআনী জমিদার বাড়ীর প্রাঙ্গণে অবস্থিত কারুকার্যময় গোবিন্দ মন্দির।
প্রবেশ মূল্য ও সময়সূচী
পুঠিয়া রাজবাড়ী জাদুঘরের প্রবেশমূল্য দেশীয় পর্যটকদের জন্য ৩০ টাকা, ছাত্র-ছাত্রীদের (মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত) জন্য ১০ টাকা, সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য ২০০ টাকা এবং বিদেশী পর্যটকদের জন্য ৪০০ টাকা। একটি টিকেটেই জাদুঘর ও সকল মন্দির পরিদর্শন করা যায়। তিন বছরের কম বয়সী শিশু এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য প্রবেশমূল্য নেই।
পুঠিয়া রাজবাড়ী ভ্রমণের প্ল্যান করার সময় দিনটি মাথায় রাখা জরুরি। এটি রবিবার সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। আর সোমবারে যদি যেতেই হয়, তবে দুপুরের পরে যাবেন; কারণ সোমবার দুপুর ২ টার আগে এখানে প্রবেশ করা যায় না। সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে (মঙ্গলবার থেকে শনিবার) সকাল ১০ টা থেকে বিকাল ৫ টার মধ্যে যেকোনো সময় ঘুরে আসতে পারেন।
কিভাবে যাবেন পুঠিয়া রাজবাড়ী
রাজধানী ঢাকা শহর থেকে সড়ক, রেল এবং আকাশ পথে রাজশাহী যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ঢাকার মহাকালী, আব্দুল্লাহপুর, গাবতলী ও কল্যাণপুর থেকে গ্রীন লাইন, একতা এবং দেশ ট্রাভেলসের এসি বাস ৯০০ থেকে ১৪০০ টাকা ভাড়ায় রাজশাহীর উদ্দেশ্যে যাতায়াত করে। আর শ্যমলি, হানিফ, ন্যাশনাল ট্রাভেলস, বাবলু এন্টারপ্রাইজ প্রভৃতি নন-এসি বাস ৭১০ থেকে ৭৫০ টাকা ভাড়ায় চলাচল করে।
ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশান থেকে রবিবার ব্যতীত সপ্তাহের ৬ দিন দুপুর ২ টা ৩০ মিনিটে সিল্কসিটি এক্সপ্রেস ট্রেন রাজশাহীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। এছাড়া পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেন মঙ্গলবার ছাড়া প্রতিদিন রাত ১০ টা ৪৫ মিনিটে, ধুমকেতু এক্সপ্রেস বৃহস্পতিবার ব্যতীত সকাল ৬ টায় ও বনলতা এক্সপ্রেস শুক্রবার ব্যতীত দুপুর ১ টা ৩০ মিনিট এ রাজশাহীর জন্য ঢাকা ত্যাগ করে। এসব ট্রেনে শ্রেনীভেদে ভাড়া শোভন চেয়ার ৪৫০-৫৮৫ টাকা, স্নিগ্ধা ৮৬৩-৯৪৯ টাকা, এসি সিট ১,০৩৫-১,৩৪০ টাকা এবং এসি বার্থ ১,৫৪৭ টাকা।
ঝটপট ও আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ও নভোএয়ার-এর বিমানে মাত্র ৪৫ মিনিটে রাজশাহী পৌঁছানো যায়। বিমানভেদে ও বুকিংয়ের সময় সাপেক্ষে ওয়ান-ওয়ে টিকিট মূল্য ৩,৮০০ থেকে ৫,৫০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।
রাজশাহী থেকে পুঠিয়া রাজবাড়ী
রাজশাহী এবং নাটোর থেকে সড়ক পথে পুঠিয়া রাজবাড়ীর দূরত্ব যথাক্রমে ৩৪ কিলোমিটার ও ১৮ কিলোমিটার। রাজশাহীগামী বা নাটোরগামী যেকোনো দূরপাল্লার বাসে চড়ে রাজশাহী-নাটোর মহাসড়কের পুঠিয়া বাসস্ট্যান্ড-এ নেমে যেতে হবে। বাসস্ট্যান্ড থেকে মাত্র ৫ থেকে ১০ মিনিট পায়ে হেঁটে কিংবা একটি লোকাল অটো বা রিকশা নিয়ে সরাসরি রাজবাড়ীর মূল প্রবেশদ্বারে পৌঁছানো যায়। এছাড়া রাজশাহী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল (শিরোইল) থেকে নাটোরগামী লোকাল বাস বা পুঠিয়ার সরাসরি লোকাল বাসে করেও খুব কম খরচে (৪০–৬০ টাকা) পুঠিয়া যাওয়া সম্ভব।
প্রফেশনাল ট্রাভেল টিপসঃ আপনি যদি ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে আসেন, তবে রাজশাহী শহরে না ঢুকে সরাসরি পুঠিয়া বাসস্ট্যান্ডেই নেমে যেতে পারেন। এতে আপনার মূল্যবান ১ থেকে ২ ঘণ্টা সময় এবং বাড়তি যাতায়াত খরচ দুটোই বেঁচে যাবে!
কোথায় থাকবেন
পুঠিয়াতে রাত্রিযাপনের জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় জেলা পরিষদের ২টি ডাকবাংলো রয়েছে। জেলা পরিষদের কর্তৃপক্ষের অনুমতি এবং নির্ধারিত ভাড়া পরিশোধের মাধ্যমে এই বাংলোগুলিতে রাতে থাকার সুব্যবস্থা আছে (জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার ফোন নম্বর: 02588855101)। এর পাশাপাশি পুঠিয়া বাসস্ট্যান্ডের সংলগ্ন এলাকাতেও কিছু সাধারণ মানের আবাসিক হোটেল পাবেন।
তবে উন্নত ও নিরাপদ পরিবেশের জন্য পুঠিয়া ভ্রমণ শেষে রাজশাহী শহরে ফিরে এসে রাত্রিযাপন করাই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত। রাজশাহী শহরে অবস্থিত বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মোটেলে ৫০০ থেকে ৭,৫০০ টাকার মধ্যে চমৎকার সব রুম পেয়ে যাবেন, যার সরাসরি যোগাযোগের নম্বর: 01778-403225 (চাইলে ঢাকার প্রধান কার্যালয় থেকেও অগ্রিম বুকিং দিতে পারবেন)। এছাড়া শহরের অন্যান্য নামী ও সাশ্রয়ী আবাসিক হোটেলের মধ্যে—হোটেল হক্স ইন, নাইস ইন্টারন্যাশনাল, মুক্তা ইন্টারন্যাশনাল, ডালাস ইন্টারন্যাশনাল এবং হোটেল শুকরান অন্যতম; যেখানে মানভেদে মাত্র ৫০০ থেকে ৩,০০০ টাকার মধ্যে আপনার জন্য উপযোগী রুম পেয়ে যাবেন।