শহীদ বুদ্ধিজীবি স্মৃতিসৌধ (Shahid Intellectual Memorial) যা রায়ের বাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ ও শহীদ বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ নামেও পরিচিত। স্মৃতি স্মারকটির অবস্থান ঢাকার মোহাম্মদপুর থানার রায়েরবাজার এলাকায়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমাপ্তিলগ্নে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের সহযোগীদের সহায়তায় দেশের যে-সকল শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবী এবং অন্যান্যদের হত্যা করেছিল তাঁদের শ্রদ্ধার নিদর্শন স্বরূপ এটি নির্মাণ করা হয়।
মুঘল আমলে তুরাগ নদীর তীরে অবস্থিত রায়ের বাজার মৃৎশিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল। ঔপনিবেশিক শাসনামল থেকে জনবসতি শুরু হয়। লালমাটির সহজলভ্যতা এবং নদী পথে পরিবহণ ব্যয় কম হওয়ার কারনে এই অঞ্চলের বেশীরভাগ কুমোর রায়েরবাজার বসবাস করতেন। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, মুঘল আমলে রায়ের বাজারকে ‘কুমারতলী’ নামে ডাকা হতো।
এই রায়ের বাজারের সাথে জড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াল স্মৃতি। মুক্তিযুদ্ধে নিশ্চিত পরাজয় বুঝতে পেরে বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার উদ্দেশ্যে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর রাতের আধারে সাংবাদিক, শিক্ষক, শিল্পী, চিকিৎসক, লেখক, প্রকৌশলীসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন পেশার বুদ্ধিজীবিদের ঘর থেকে তুলে নিয়ে যায়। এদের মধ্যে ছিলেন ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব, মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, শহিদুল্লাহ কায়সার, ডাঃ ফজলে রাব্বীসহ আরো অনেকে। এরপর বাংলার সূর্য্য সন্তানদের নৃশংসভাবে হত্যা করে তাঁদের লাশ রায়ের বাজারের ইটখোলায় ফেলে রাখে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর রায়েরবাজারের ইটখোলায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পচা গলা লাশের স্থুপ দৃষ্টিগোচর হয়।
শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতিকে স্মরনীয় করে রাখতে ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ সরকার রায়েরবাজারের বধ্যভূমিতে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। পরবর্তীতে স্থপতি ফরিদউদ্দীন আহমেদ এবং স্থপতি জামি-আল-শফি-র নকশায় ১৯৯৬ সালে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়ে ১৯৯৯ সালে শেষ হয়।
রায়ের বাজার বধ্যভূমি (Rayer Bazar Bodhyo Bhumi) এলাকাটির আয়তন ৩.৫১ একর। স্মৃতিসৌধের প্রধান অংশে রয়েছে ১৭.৬৮ মিটার উচ্চতা, ০.৯১ মিটার প্রস্থ এবং ১১৫.৮২ মিটার দৈর্ঘ্যের ইটের তৈরি দুই প্রান্ত ভাঙ্গা এবং বাঁকানো একটি দেয়াল। যা ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবীদের মৃতদেহ প্রাপ্তির ইটখোলাকে নির্দেশ করে। আর দেয়ালের ভগ্ন দুইপ্রান্ত বুদ্ধিজীবী হত্যার দুঃখ এবং শোকের গভীরতা নির্দেশ করছে। দেয়ালের দক্ষিণ-পশ্চিমে একটি বর্গাকৃতির জানালা রয়েছে। জানালা দিয়ে পেছনের আকাশ দেখা যায়। আর এই জানালাটি দেয়ালের শোকের গভীরতা কমিয়ে আশার বাণী বয়ে আনে।
বাঁকা দেয়ালের সামনে রয়েছে একটি স্থির জলাধার, যেখানে পানির নিচ থেকে কালো গ্র্যানাইট পাথরের একটি স্তম্ভ উপরে উঠে এসেছে। যা মুহ্যমান শোকের প্রতীক। এছাড়াও রায়ের বাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ চত্বরে একটি ছোট জাদুঘর, অফিস কক্ষসহ একটি পাঠাগার এবং একটি কবরস্থান নির্মাণের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আছে।
পরিদর্শনের সময়সূচী
রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ প্রতিদিন সকাল ৯ টা থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত সকল দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। তবে এখানে রাতের বেলায় প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে প্রবেশের জন্য কোন প্রবেশ টিকেটের প্রয়োজন হয় না।
কিভাবে যাবেন
শহীদ বুদ্ধিজীবি স্মৃতিসৌধ যেতে হলে দেশের যে কোন জায়গা থেকে প্রথমেই ঢাকার মোহাম্মদপুর চলে আসুন। সেখান থেকে রিক্সায় সহজেই যেতে পারবেন রায়ের বাজারের এই শহীদ বুদ্ধিজীবি স্মৃতিসৌধে।
ঢাকার যে কোন জায়গা থেকে মোহাম্মদপুর আসার বাস সার্ভিস পাবেন অথবা আপনার ব্যাক্তিগত গাড়ি, সিএনজি দিয়ে সহজেই চলে আসতে পারবেন মুক্তিযুদ্ধের এই স্মৃতিস্মারক দেখতে।