রোজ গার্ডেন প্যালেস ( Rose Garden Palace ) যা রোজ গার্ডেন হিসেবে পরিচিত, বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। এটির অবস্থান রাজধানী ঢাকা শহরের পুরান ঢাকার টিকাটুলিতে। ১৯ শতকে হৃষিকেস দাস নামের ধনী ব্যবসায়ী বিনোদনের জন্য রোজ গার্ডেন প্যালেসটি নির্মাণ করেন। এই প্রাচীন ভবনটি বাংলাদেশের ঐতিহাসিক পুরাকীর্তি হিসাবে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক সংরক্ষিত।
রোজ গার্ডেনের ইতিহাস
ঋষিকেশ দাস ছিলেন ব্রিটিশ আমলের নতুন ধনী ব্যবসায়ী। সাধারণ পরিবার থেকে আসায় ঢাকার অভিজাত পরিবারগুলো তাকে তেমন গুরুত্ব দিত না। শোনা যায়, একবার বলধা গার্ডেনের এক আসরে অপমানিত হয়ে তিনি সেখান থেকে চলে আসেন। এরপরই তিনি নিজের বাগানবাড়ি তৈরির সিদ্ধান্ত নেন।
১৯৩১ সালে পুরান ঢাকার ঋষিকেশ দাস রোডে তিনি তৈরি করেন রোজ গার্ডেন, যেখানে প্রচুর গোলাপ গাছ থাকায় এর হয় রোজ গার্ডেন। তবে বাড়ি সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি দেউলিয়া হয়ে পড়েন এবং ১৯৩৭ সালে এটি বিক্রি করতে বাধ্য হন খান বাহাদুর আবদুর রশীদের কাছে। পরে এর নাম রাখা হয় “রশীদ মঞ্জিল”।
আবদুর রশীদের মৃত্যুর পর রোজ গার্ডেনের মালিকানা পান তার বড় ছেলে কাজী মোহাম্মদ বশীর (হুমায়ূন সাহেব)।১৯৭০ সালে বেঙ্গল স্টুডিও রোজ গার্ডেন ভাড়া নেয় এবং এখানে জনপ্রিয় সিনেমা হারানো দিন শুটিং হয়। সে সময় এটি “হুমায়ুন সাহেবের বাড়ি” নামেও পরিচিতি পায়।
১৯৮৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ভবনটিকে সংরক্ষিত ঘোষণা করে। পরে আইনি জটিলতার পর মালিকানা ফেরত আসে কাজী আবদুর রশীদের পরিবারে। অবশেষে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকার প্রায় ৩৩২ কোটি টাকায় রোজ গার্ডেন প্যালেস ক্রয় করে এবং বর্তমানে এটি সরকারের মালিকানায় রয়েছে।
রোজ গার্ডেন প্যালেসের এক ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। ১৯৪৯ সালে এই রোজ গার্ডেনেই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ (বর্তমানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ) গঠিত হয়।
স্থাপত্য ও বৈশিষ্ট্য
রোজ গার্ডেন প্যালেস তৈরি হয়েছিল ২২ বিঘা জমির উপর। ভবনটির আয়তন প্রায় ৭,০০০ বর্গফুট এবং উচ্চতা ৪৫ ফুট। এটি ছয়টি শক্ত থামের উপর দাঁড়িয়ে আছে, আর প্রতিটি থামে লতাপাতার সুন্দর নকশা করা হয়েছে। প্রাসাদের নকশায় করিন্থীয় ও গ্রীক স্থাপত্যশৈলী ব্যবহার করা হয়েছে।
বাড়িটির নীচতলায় একটি হলরুম, আটটি কক্ষ রয়েছে। উপর তলায় আরো একটি হল সহ আরও পাঁচটি কক্ষ রয়েছে। একসময় প্রাসাদ প্রাঙ্গণে একটি ঝর্ণা ছিল, বর্তমানে ঝর্ণাটি চালু না থাকলেও এর চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়। প্রাসাদের সামনে বাগানে রয়েছে মার্বেলের তৈরি কয়েকটি সুদৃশ্য মূর্তি। তবে যেই গোলাপের বাগানের জন্য এই প্রাসাদটির নামকরণ রোজ গার্ডেন প্যালেস করা হয়েছিল সেই গোলাপ বাগান বর্তমানে নিশ্চিহ্ন।
🏛️ সময়সূচি ও টিকিট মূল্য
🕰️ সময়সূচি
শীতকালীন সময় (অক্টোবর – মার্চ): সকাল ৯:০০টা থেকে বিকাল ৫:০০টা পর্যন্ত
গ্রীষ্মকালীন সময় (এপ্রিল – সেপ্টেম্বর): সকাল ১০:০০টা থেকে বিকাল ৬:০০টা পর্যন্ত
রবিবার: বন্ধ (সাপ্তাহিক বন্ধ)
সোমবার: দুপুর ২:০০ টা থেকে খোলা থাকে
🎟️ প্রবেশ টিকিট মূল্য
সাধারণ দর্শনার্থী: ৩০ টাকা
শিক্ষার্থী: ১০ টাকা (আইডি কার্ড আবশ্যক)
১০ বছরের কম বয়সী শিশু: ফ্রি (টিকিট লাগবে না)
সার্কভুক্ত দেশের পর্যটক: ২০০ টাকা
বিদেশী পর্যটক: ৪০০ টাকা
অনলাইন টিকেট দর্শনার্থীরা চাইলে myGOV ওয়েবসাইট থেকে ঘরে বসেই কিউআর কোডযুক্ত অনলাইন টিকেট কিনতে পারবেন, যা মোবাইলে বা প্রিন্ট আউট করে ব্যবহারযোগ্য।
📸 পূর্ব অনুমতি ছাড়া ফটোশুট, ভিডিও শুট এবং ড্রোন ব্যবহার নিষেধ
আশেপাশের দর্শনীয় স্থান
রোজ গার্ডেনের কাছেই রয়েছে বলধা গার্ডেন ও খ্রিষ্টান কবরস্থান। হাতে সময় থাকলে বলধা গার্ডেন এবং পুরান ঢাকার দর্শনীয় স্থান গুলো দেখে যেতে পারেন।
কিভাবে যাবেন
ঢাকার যেকোন স্থান থেকে গুলিস্থান বা যাত্রাবাড়ী এসে রিক্সায় দিয়ে সরাসরি টিকাটুলির কেএম দাস লেনের রোজ গার্ডেন আসতে পারবেন। তবে রিকশাওয়ালাকে চেনানোর জন্য হুমায়ূন সাহেবের বাড়ির কথা বলতে হবে।
কোথায় খাবেন
খাবারের জন্য পুরান ঢাকার রয়েছে বিশেষ ঐতিহ্য। আল রাজ্জাক, হাজীর বিরিয়ানি, হানিফ বিরিয়ানি, বিউটি লাচ্চি, ক্যামে কর্ণারের ক্রাম্ব চাপ, বিউটি বোডিং থেকে নিঃসন্দেহে বেছে নিতে পারেন যা খাবেন।