ঢাকার কাছে সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নে সাদুল্লাপুর গ্রাম অবস্থিত। তুরাগ নদীর তীরের সাদুল্লাপুর গ্রামটিই বর্তমানে গোলাপ গ্রাম হিসেবে পরিচিত। যান্ত্রিক জীবনে অল্প সময়ের অবসরে যদি ঢাকার আশেপাশে একদিনের জন্য কোথাও ঘুরতে চান তবে গোলাপ ফুলের রাজ্য থেকে ঘুরে আসতে পারেন। নানা রঙের গোলাপ ফুল দিয়ে ঘেরা সমস্ত সাদুল্লাহপুর গ্রামটিকে একটি বাগান মনে হয়। এখানে সাধারণত মিরান্ডি জাতের গোলাপের চাষ বেশি হয়। গ্রামের বুকের উপর দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তার দুপাশের বিস্তীর্ণ গোলাপের বাগান সারাক্ষণ মোহিত করে রাখবে। সাদুল্লাহপুর পুরো গ্রামে আপনি গোলাপের সৌরভ পাবেন।
এখান থেকে চাইলে পছন্দমতো গোলাপ কিনে নিতে পারেন। তবে চাষিরা সাধারণত খুচরা গোলাপ (একটি বা দুটি) বিক্রি করতে চায় না। বাগান থেকে সরাসরি কিনতে চাইলে বড় পরিমাণে বা আটি ধরে কিনতে হয়। গোলাপ গ্রাম ( Rose Village ) হিসেবে পরিচিতি পেলেও সাদুল্লাহপুর ও সংলগ্ন গ্রামগুলোতে এখন ব্যাপকভাবে জারভারা, গ্লাডিওলাস এবং রজনীগন্ধা ফুলের চাষ করা হচ্ছে। ঢাকার শাহবাগসহ দেশের অন্যান্য বড় ফুলের বাজারের চাহিদা মেটানোর অন্যতম প্রধান যোগানদাতা হচ্ছে এই এলাকা। স্থানীয় ফুল চাষীদের উদ্যোগে শ্যামপুর ও মোস্তাপাড়া এলাকায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় গোলাপের হাট বসে। ফুল কিনতে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এখানে অনেক পাইকারি ব্যবসায়ী আসেন।
কি কি দেখবেন
গোলাপের বাগান ছাড়াও বিরুলিয়াতে অত্যাধুনিক গ্রিনহাউস পদ্ধতিতে চাষ করা জারভারা ও গ্লাডিওলাসের বাগান রয়েছে। হাতে সময় থাকলে বিরুলিয়ার প্রাচীন জমিদার বাড়িগুলো দেখে নিতে পারেন যা সংস্কারের ফলে পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়েছে। এছাড়া বিরুলিয়া ব্রিজের কাছের প্রাচীন বটগাছটি এখনো এই অঞ্চলের অন্যতম ল্যান্ডমার্ক।
কখন যাবেন
বছরের প্রায় সব সময়ই সাদুল্লাহপুর গোলাপ ফুলের চাষ হয়। তবে শীতকাল (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) হচ্ছে গোলাপ ফুল ফোটার উপযুক্ত সময়। এ সময় ফুলগুলো বেশ সতেজ ও আকারে বড় থাকে। পুরো বাগান তখন ফুলে ফুলে ভরে থাকে। তবে মনে রাখবেন, শুক্রবার ও ছুটির দিনগুলোতে অতিরিক্ত ভিড় থাকে, তাই নিরিবিলিতে ঘুরতে চাইলে সপ্তাহের অন্য দিনে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
কোথায় খাবেন
সাদুল্লাহপুর ঘাটে ও বাজারে বেশ কিছু সাধারণ ও মাঝারি মানের খাবার হোটেল গড়ে উঠেছে। এছাড়া বিরুলিয়া ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় এখন আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন কিছু ক্যাফে ও রেস্টুরেন্ট হয়েছে যেখানে দেশি খাবারের পাশাপাশি ফাস্ট ফুড পাওয়া যায়। তবে ঐতিহ্যগতভাবে সাদুল্লাহপুর ঘাটের বটতলার চা-নাস্তা পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। যদি বড় গ্রুপ করে যান তবে আগেভাগেই স্থানীয় হোটেলগুলোতে খাবারের অর্ডার দিয়ে রাখা ভালো। এছাড়া এলাকার বিখ্যাত গরম গরম পেঁয়াজির স্বাদ নিতে ভুলবেন না।
কিভাবে যাবেন
ঢাকা ও তার আশপাশ থেকে যেতে পারবেন অনেক ভাবেই। কিছু রুট প্ল্যান দেওয়া হলো নিচে।
রুট প্ল্যান ১ (উত্তরা ও দিয়াবাড়ি হয়ে): উত্তরা হাউজ বিল্ডিং বা নর্থ টাওয়ার থেকে লেগুনা বা রিকশায় দিয়াবাড়ি (মেট্রোরেল স্টেশন এলাকা) আসতে হবে। সেখান থেকে বিরুলিয়া ব্রিজ যাওয়ার লোকাল গাড়ি বা অটো পাওয়া যায়। বিরুলিয়া ব্রিজ থেকে ৩০-৪০ টাকা অটো ভাড়ায় সরাসরি সাদুল্লাহপুর চলে আসা যায়। এছাড়া বিরুলিয়া ব্রিজ থেকে এখন নিয়মিত সিএনজি ও ইজিরাইড পাওয়া যায়।
রুট প্ল্যান ২ (মিরপুর বেড়িবাঁধ হয়ে): মিরপুর-১ বা গাবতলী থেকে বেড়িবাঁধ হয়ে বিরুলিয়া ব্রিজে আসার সরাসরি বাস ও লেগুনা পাওয়া যায়। বিরুলিয়া ব্রিজ পার হয়ে অটোতে করে সাদুল্লাহপুর যাওয়া সব থেকে সহজ উপায়। বর্তমানে রাস্তার অবস্থা আগের চেয়ে অনেক উন্নত হওয়ায় যাতায়াতে সময় কম লাগে।
রুট প্ল্যান ৩ (নৌপথ): মিরপুর দিয়াবাড়ি ঘাট (উত্তরার দিয়াবাড়ি নয়) থেকে এখনো ইঞ্জিন চালিত নৌকা ও ট্রলার সাদুল্লাহপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। লোকাল নৌকায় জনপ্রতি ভাড়া এখন ৩০-৪০ টাকা এবং সময় লাগে প্রায় ৩০-৪০ মিনিট। এছাড়া ব্যক্তিগতভাবে নৌকা বা স্পিডবোট রিজার্ভ করে ভ্রমণ করা যায়, যার ভাড়া দূরত্ব ও সময় অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।
বর্তমানে বিরুলিয়া ব্রিজ হয়ে সড়কপথে যাওয়াই সবচেয়ে আরামদায়ক ও দ্রুততম উপায়। এই পথে রাস্তার দুই পাশে গোলাপের ক্ষেত দেখতে দেখতে যাওয়া যায়। তবে প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে চাইলে নৌপথ বেছে নিতে পারেন।
মনে রাখুন সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৭টার পর নদীপথে নৌকা চলাচল সীমিত হয়ে যায়, তাই ফেরার সময় হাতে রেখে রওয়ানা দেওয়া উচিত। এছাড়া বাগানে ঢুকে ফুল ছেঁড়া বা গাছ নষ্ট করা থেকে বিরত থাকুন।