কুলুমছড়া ঝর্ণা (Kulumchora Waterfall) সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সোনারহাট সীমান্তে অবস্থিত। সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে ছুটে চলা এই ঝর্ণার ধবধবে সাদা পানি আর সেই পানির তীব্র স্রোতেই জন্ম নিয়েছে এক অপরূপ পাথুরে ছড়া। এটি ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এক রহস্যময় ও মায়াবী স্থান। সিলেটের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র ‘ বিছনাকান্দি ‘র খুব কাছাকাছি হলেও, কুলুমছড়া অনেকটাই যেন প্রকৃতির এক গোপন ও অচেনা ঝর্ণা। যারা বিছনাকান্দি থেকে হাইকিং করে জাফলং যান, তারা অনেকেই এই ছড়ার সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন। এই ছড়ার পানির মূল উৎস ভারতের মেঘালয় পাহাড়। ছড়ার সামনে দাঁড়ালে যে গর্জন শোনা যায়, তা মূলত সীমান্ত পেরিয়ে আসা পানির সুর। তাই অনেকে মজা করে বলেন, এখানে এক পা রাখলেই যেন পৌঁছে যাওয়া যায় কুলুমছড়ার জন্মভূমিতে।
অনেকে মনে করেন কুলকুল শব্দে বয়ে চলে বলেই হয়তো এর নাম কুলুমছড়া; কিন্তু আসলে তা নয়। ছড়াটি স্থানীয় ‘কুলুম’ নামের একটি গ্রামে অবস্থিত বলেই এর নামকরণ করা হয়েছে কুলুমছড়া।
ভ্রমণের উপযুক্ত সময়
কুলুমছড়া আসার সবচেয়ে ভালো সময় হলো জুলাই থেকে অক্টোবর মাস। তবে আসার আগে অবশ্যই বৃষ্টির পূর্বাভাস জেনে নেওয়া উচিত। কারণ, বৃষ্টি না হলে ছড়ায় পানি একদম কমে যায়, আবার টানা ভারী বৃষ্টি হলে ছড়ার স্রোত বন্য ও বিপজ্জনক রূপ ধারণ করে।
কিভাবে যাবেন
ঢাকা বা দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রথমে সিলেট শহরে আসতে হবে। সিলেট শহরের আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে সিএনজি, লেগুনা অথবা বাইকে করে চলে আসতে হবে গোয়াইনঘাট উপজেলার হাদারপাড় নৌকা ঘাটে। সিএনজি রিজার্ভ ভাড়া ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে।
হাদারপাড় ঘাট থেকে নৌকা ভাড়া করে পিয়াইন নদীর অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে দেখতে চলে আসবেন বিছনাকান্দি। সবগুলো স্পটসহ নৌকা ভাড়া ১,৫০০ থেকে ৩,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
বিছনাকান্দিতে নামার পর খাবারের দোকানগুলো যেদিকে, তার ঠিক উল্টো দিকে মেঘালয় পাহাড়কে বাম পাশে রেখে সবুজ পথ আর মেঘের ভেলা দেখতে দেখতে ৩০ মিনিট হাঁটলেই কুলুমছড়ার প্রবেশমুখে পৌঁছানো যায়।
প্রবেশমুখ থেকে ছড়ার প্রবল স্রোত ডিঙিয়ে (যা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ) জঙ্গলের গুহার ভেতর দিয়ে আরও ৫ মিনিটের একটি রোমাঞ্চকর পথ পাড়ি দিলেই দূর থেকে ভেসে আসা শান্ত স্রোতের শব্দ রূপ নেয় প্রচণ্ড গর্জনে, আর সামনে দৃশ্যমান হয় কাঙ্ক্ষিত কুলুমছড়া ঝর্ণা।
কোথায় থাকবেন
কুলুমছড়া বা হাদারপার এলাকায় থাকার কোনো হোটেল নেই। তাই আপনাকে সিলেট শহরেই ফিরে এসে থাকতে হবে। সিলেটের দরগা গেইট বা জিন্দাবাজারে ৫০০ থেকে ১,৫০০ টাকার বাজেটে হোটেল এবং লালাখাল বা জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় লাক্সারি রিসোর্ট পেয়ে যাবেন।
আরও পড়ুনঃ সিলেটের সেরা সব হোটেল ও রিসোর্ট গাইড
কোথায় খাবেন
বিছনাকান্দিতে বেশ কয়েকটি রেস্তোরাঁ আছে। সেখানে দুপুরের খাবার সেরে নিতে পারেন অথবা যাওয়ার সময় অর্ডার দিয়ে যেতে পারেন। ভাগ্য ভালো হলে মেঘালয় পাহাড়ের মনমুগ্ধকর ভিউ দেখতে দেখতে দুপুরের খাবার উপভোগ করতে পারবেন। এছাড়া সন্ধ্যায় সিলেট শহরের জিন্দাবাজারের পানসী বা পাঁচ ভাই রেস্তোরাঁয় যেতে পারেন।
ভ্রমণ পরামর্শ
যেহেতু ঝর্ণার আপস্ট্রিম বা মূল অংশটি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থিত, তাই সেখানে বিজিবি (BGB) মোতায়েন থাকলে বা নিষেধাজ্ঞা থাকলে ওপরে না যাওয়াই উত্তম। কোনোভাবেই সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করবেন না।
ভালো সাঁতার জানা না থাকলে কোনোভাবেই ছড়ার তীব্র স্রোতে বা ঝর্ণার পানিতে গোসলে নামবেন না। একটি ভুল পদক্ষেপ বড় বিপদের কারণ হতে পারে।
ছড়ার প্রবল পাহাড়ি ঢল এবং পিচ্ছিল পাথরের ওপর দিয়ে হাঁটার সময় অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করুন এবং গ্রিপিং জুতো ব্যবহার করুন।
চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের বোতল ফেলে এই আদিম ও শান্ত প্রকৃতির পরিবেশ নষ্ট করবেন না।