হোলি উৎসব
আসন্ন🇧🇩 বাংলাদেশআর ১৭৮ দিন

হোলি উৎসব

সোমবার, ২২ মার্চ, ২০২৭ – মঙ্গলবার, ২৩ মার্চ, ২০২৭

শাখারী বাজার, ঢাকা

📅 কবে

সোমবার, ২২ মার্চ, ২০২৭ – মঙ্গলবার, ২৩ মার্চ, ২০২৭

📍 কোথায়

শাখারী বাজার, ঢাকা

⏳ অবস্থা

আর ১৭৮ দিন

ইভেন্ট সম্পর্কে

বসন্তের হাওয়ায় যখন প্রকৃতি নতুন রঙে সেজে ওঠে, ঠিক তখনই বাংলাদেশের পথে-ঘাটে, মন্দিরে-অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়ে আবিরের রঙ, কীর্তনের সুর আর আনন্দের জোয়ার। এই উৎসবের নাম দোলযাত্রা বা হোলি — সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ও সবচেয়ে রঙিন উৎসব। শুধু ধর্মীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়, বাংলাদেশে এই উৎসব সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়।

হোলি ও দোলযাত্রা: নামের পার্থক্য

অনেকেই “হোলি” এবং “দোলযাত্রা” শব্দ দুটিকে সমার্থক মনে করেন। তবে এদের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে।

  • দোলযাত্রা — বাংলার নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী উৎসব, যা মূলত রাধা-কৃষ্ণের দোললীলার স্মরণে পালিত হয়। দোলে (পালকিতে) চড়িয়ে রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহের শোভাযাত্রা করা এই উৎসবের মূল বৈশিষ্ট্য।
  • হোলি — মূলত উত্তর ভারতীয় পরিভাষা, যা হোলিকা দহনের কাহিনীর সাথে সম্পর্কিত। বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে এটি “দোল পূর্ণিমা” বা “বসন্ত উৎসব” নামেও পরিচিত।

বর্তমানে বাংলাদেশে দুটি নামই সমানভাবে প্রচলিত এবং একই দিনে একই আনন্দে উদযাপিত হয়।

উৎসবের পৌরাণিক ইতিহাস ও কারণ

১. রাধা-কৃষ্ণের দোললীলা

বৈষ্ণব বিশ্বাস ও পুরাণ অনুসারে, দোলযাত্রার উৎপত্তি বৃন্দাবনে। ফাল্গুনী পূর্ণিমার পবিত্র দিনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ রাধারানি ও গোপীগণের সাথে আবির-গুলাল নিয়ে রঙ খেলায় মেতেছিলেন। সেই ঐশ্বরিক প্রেম ও আনন্দের অনুসরণেই প্রতি বছর দোলযাত্রা পালিত হয়। এটি শুধু রঙের উৎসব নয়, এটি রাধা-কৃষ্ণের চিরন্তন প্রেমের উদযাপন।

২. হোলিকা দহনের কাহিনী

বিষ্ণুপুরাণ অনুসারে, দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু নিজেকে ঈশ্বর দাবি করে রাজ্যে বিষ্ণু আরাধনা নিষিদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর পুত্র প্রহ্লাদ ছিলেন পরম বিষ্ণুভক্ত। প্রহ্লাদকে হত্যা করার জন্য হিরণ্যকশিপু তাঁর বোন হোলিকার সাহায্য নেন, যার কাছে আগুনে না পোড়ার বর ছিল। হোলিকা প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করে। কিন্তু বিষ্ণুর কৃপায় প্রহ্লাদ অক্ষত থাকেন এবং হোলিকা ভস্মীভূত হয়। এই অশুভের উপর শুভের বিজয়কে স্মরণ করে হোলিকা দহন বা ন্যাড়াপোড়ার রীতি পালিত হয়।

৩. শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মতিথি

বাংলার মানুষের কাছে এই তিথি আরও বিশেষ কারণে পবিত্র — ১৪৮৬ সালের এই দোল পূর্ণিমায় নবদ্বীপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। তাই বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের কাছে এটি “গৌর পূর্ণিমা” নামে এক বিশেষ পবিত্র তিথি।

কখন হয় এই হোলি উৎসব?

হোলি বা দোলযাত্রা পালিত হয় হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে, যা সাধারণত ইংরেজি ফেব্রুয়ারি বা মার্চ মাসে পড়ে।

উৎসব মূলত দুই দিন ধরে চলে:

  • প্রথম দিন (হোলিকা দহন / ন্যাড়াপোড়া): পূর্ণিমার আগের সন্ধ্যায় কাঠ ও খড় দিয়ে আগুন জ্বালানো হয়, যা অশুভ শক্তির ধ্বংসের প্রতীক।
  • দ্বিতীয় দিন (মূল উৎসব): আবির, গুলাল ও রঙিন জলে রঙ খেলা, কীর্তন, শোভাযাত্রা এবং সামাজিক মেলামেশা।

বাংলাদেশে এটি ঐচ্ছিক সরকারি ছুটির দিন হিসেবে স্বীকৃত।

হোলি উৎসব কোথায় হয় এবং দেখতে যাওয়ার জন্য সেরা স্থান

ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, ঢাকা

বাংলাদেশের জাতীয় হিন্দু মন্দির ঢাকেশ্বরী দোলযাত্রার কেন্দ্রবিন্দু। হাজার হাজার ভক্ত ও দর্শনার্থী এখানে একত্রিত হন। ভোরবেলা বিশেষ পূজা-হোম অনুষ্ঠিত হয়, প্রসাদ বিতরণ করা হয় এবং এরপর শুরু হয় রঙের উৎসব। এটি উৎসবের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক উভয় দিক উপভোগের সেরা জায়গা।

শাঁখারি বাজার, পুরান ঢাকা

পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক শাঁখারি বাজার হোলির প্রাণকেন্দ্র। এই সংকীর্ণ গলিটি উৎসবের দিন রূপান্তরিত হয় এক বিশাল রঙিন মেলায়। বিভিন্ন বয়সের মানুষ বালতি ও বোতল দিয়ে রঙিন জল ছিটান, গান গান। পাশের তাঁতীবাজার ও ওয়ারীতেও উৎসাহী জমায়েত দেখা যায়। এখানকার কেউ কেউ ভগবান কৃষ্ণের মতো মুখে নীল রং লাগিয়ে উৎসব করেন — এটি একটি বিশেষ স্থানীয় ঐতিহ্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় — জগন্নাথ হল ও চারুকলা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল এবং চারুকলা অনুষদ এলাকায় তরুণ প্রজন্মের উৎসাহে দোলযাত্রা পরিণত হয় এক অসাধারণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ছাত্র-ছাত্রীরা একসাথে রঙ খেলে, নাচে-গানে মেতে ওঠে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেও বড় আয়োজন হয়।

ইসকন মন্দির, স্বামীবাগ, ঢাকা

ইসকন (ISKCON) মন্দিরে দোল পূর্ণিমায় বিশেষ কীর্তন, ভজন ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উৎসব পালিত হয়। রামকৃষ্ণ মিশনেও বিশেষ আয়োজন থাকে। যারা উৎসবের আধ্যাত্মিক দিকটি গভীরভাবে অনুভব করতে চান, তাদের জন্য এটি আদর্শ।

ঢাকার বাইরের উল্লেখযোগ্য স্থান

  • চট্টগ্রাম — পটিয়া, রাউজান এলাকায় হিন্দু অধ্যুষিত পাড়াগুলোতে বর্ণাঢ্য উৎসব
  • সিলেট — মণিপুরি সম্প্রদায়ের “মণিপুরি দোল” অত্যন্ত বিশেষ ও দর্শনীয়
  • খুলনা ও যশোর — হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় ঐতিহ্যবাহী দোলযাত্রা
  • ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর — বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলে ঐতিহাসিকভাবে জমকালো উৎসব পালিত হয়

কী কী আয়োজন থাকে?

আবির ও গুলাল খেলা

উৎসবের মূল আকর্ষণ হলো আবির (শুকনো রঙের গুঁড়া) দিয়ে রঙ খেলা। লাল, হলুদ, সবুজ, নীল — নানা রঙের আবির দিয়ে একে অপরকে রাঙিয়ে দেওয়া হয়। রঙিন জলও ছিটানো হয় আনন্দের সাথে।

কীর্তন ও ভজন

মন্দিরে মন্দিরে সারারাত ও সারাদিন ধরে চলে রাধা-কৃষ্ণের মহিমায় কীর্তন, ভজন ও নামসংকীর্তন। হারমোনিয়াম, মৃদঙ্গ, করতালের সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে পরিবেশ।

দোলের শোভাযাত্রা

রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহকে ফুল-আবিরে সজ্জিত দোলায় (পালকিতে) বসিয়ে বের করা হয় শোভাযাত্রা। ঢোল-ঢাক-বাদ্যের তালে তালে ভক্তরা মিছিলে অংশ নেন।

হোলিকা দহন (ন্যাড়াপোড়া)

উৎসবের আগের রাতে খড়, কাঠ ও পুরনো জিনিসপত্র দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে হোলিকা দহন করা হয়। বাংলায় এটি “ন্যাড়াপোড়া” বা “বুড়ির ঘর পোড়ানো” নামে পরিচিত।

প্রসাদ ও মিষ্টি বিতরণ

মন্দিরে পূজার পর ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। বাড়িতে বাড়িতে তৈরি হয় বিশেষ মিষ্টি — সন্দেশ, খিচুড়ি, নারকেলের নাড়ু ও নানা ধরনের পিঠা।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও শহরের বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো আয়োজন করে নৃত্য, সঙ্গীত, আবৃত্তি ও নানা পরিবেশনা।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উৎসব

বাংলাদেশে হোলি কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসব নয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশে হোলি পরিণত হয়েছে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও বন্ধুত্বের প্রতীক-এ। মুসলিম প্রতিবেশীরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে হিন্দু বন্ধুদের সাথে রঙ খেলায় অংশ নেন, মিষ্টি ভাগ করে খান। এই দৃশ্য বাংলাদেশের চিরন্তন সামাজিক বন্ধনের সাক্ষ্য দেয়।

হোলি দেখতে গেলে যা মাথায় রাখবেন

  • পোশাক: পুরনো বা এমন পোশাক পরুন যা রঙে নষ্ট হলেও আফসোস নেই
  • মোবাইল ও ক্যামেরা: ওয়াটারপ্রুফ কভারে রাখুন বা প্লাস্টিক ব্যাগে মুড়ে রাখুন
  • ত্বকের যত্ন: রঙ মাখার আগে মুখে ও শরীরে নারকেল তেল বা ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে নিন
  • সকাল সকাল যান: উৎসবের মূল রঙ খেলা সাধারণত সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে হয়
  • খোলা মন নিয়ে যান: স্থানীয়দের আনন্দে সাদরে অংশ নিন — এই উৎসবে সবাই সমান

হোলি বা দোলযাত্রা শুধু রঙের উৎসব নয় — এটি মন্দের উপর ভালোর জয়, শীতের বিদায় ও বসন্তের আগমনের উদযাপন, এবং সর্বোপরি মানুষে-মানুষে প্রেম ও ভালোবাসার বন্ধন রচনার উৎসব। বাংলাদেশে এই উৎসব প্রতিটি মানুষকে একটি সুতোয় গেঁথে দেয় — রঙের মতোই যেন মিলিয়ে দেয় সব ভেদাভেদ। তাই আসুন, এই রঙিন মহোৎসবে আনন্দের রঙ ছড়িয়ে দিই সবার মাঝে।

ছবি

লোকেশন

Shakhari Bazar Road, Dhaka, Dhaka Division, Bangladesh

দিকনির্দেশ দেখুন ↗
#dhaka#festival#holi#Old Dhaka#Puran Dhaka#Shakhari Bazar