বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ এবং সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় জলাভূমির নাম চলন বিল (Chalan Beel)। নাটোর , সিরাজগঞ্জ এবং পাবনা জেলাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট অনেকগুলো বিলের সমষ্টি এই চলন বিল। বর্ষায় দ্বীপের মতো ভাসমান সবুজ গ্রাম, শীতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা অতিথি পাখির কলরব, সুনীল আকাশ এবং শরতে বিলের পাড় ধরে ফুটে থাকা কাশবনের অনন্য সৌন্দর্য আগত দর্শনার্থীদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। তবে শুধুমাত্র ভরা বর্ষায় চলন বিলের প্রকৃত ও প্রলয়ঙ্করী রূপ ধরা পড়ে, যখন প্রায় ৩৬৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জলে একাকার হয়ে সাগরের মতো রূপ নেয়। বর্ষাকাল ছাড়াও প্রায় সারাবছরই চলন বিলের বুকে নৌকায় ভেসে বেড়াতে কিংবা বিলের বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবনযাত্রা উপভোগ করতে অসংখ্য পর্যটক এখানে ছুটে আসেন।
একসময় চলন বিলের মোট আয়তন ছিল ৫০০ বর্গমাইল বা প্রায় ১৪২৪ বর্গকিলোমিটার। তবে মানুষের হস্তক্ষেপ ও পলি জমার কারণে বর্তমানে চলন বিলের মূল আয়তন কমে ১১৫০ বর্গ কিলোমিটারে পরিণত হয়েছে। চলন বিলের সাথে ছোট ছোট অসংখ্য বিল খালের মাধ্যমে এসে যুক্ত হয়েছে। পিপরূল, লারোর, ডাঙাপাড়া, তাজপুর, নিয়ালা, মাঝগাঁও, চোনমোহন, শাতাইল, দারিকুশি, গজনা, বড়বিল, সোনাপাতিলা এবং ঘুঘুদহ তেমনি কিছু বিলের নাম।
চলন বিলের বুকে মিশে গেছে করতোয়া, আত্রাই, গুড়, বড়াল, মরা বড়াল, তুলসী, ভাদাই সহ বেশ কয়েকটি নদী। মাছে সমৃদ্ধ চলন বিলে আছে চিতল, মাগুর, কৈ, শিং, বোয়াল, টাকি, শোল, মৃগেল, চিংড়ি, টেংরা, কালিবাউশ, রিটা, মৌসি, গজার, বৌ, সরপুটি, পুঁটি, গুজা, গাগর, বাঘাইর কাঁটা, তিতপুটি সহ বিভিন্ন সুস্বাদু প্রজাতির মাছ।
চলন বিল ভ্রমণের সেরা সময়
চলন বিল একেক ঋতুতে একেক রূপ ধারণ করে। তবে আপনার ভ্রমণের উদ্দেশ্য কী, তার ওপর নির্ভর করবে আপনার কখন যাওয়া উচিত।
ভরা বর্ষা (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর): যদি আপনি মাইলের পর মাইল অথৈ জলরাশি, উত্তাল ঢেউ আর ভাসমান দ্বীপের মতো গ্রামের সৌন্দর্য দেখতে চান, তবে বর্ষাকালই সেরা সময়। এই সময়ে বিলের আসল রূপ দেখা যায়।
শীতকাল (নভেম্বর থেকে জানুয়ারি): আপনি যদি পাখিপ্রেমী হন, তবে শীতকালে আসুন। এই সময়ে বিলের জল কমে যায় এবং সুদূর সাইবেরিয়া সহ বিভিন্ন শীতপ্রধান দেশ থেকে আসা হাজার হাজার অতিথি পাখির মেলা বসে এখানে।
শুকনো মৌসুমে (ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল) চলন বিলের বেশির ভাগ অংশই ফসলি জমিতে পরিণত হয়। এই সময়ে এলে আপনি কেবল দিগন্ত বিস্তৃত সরিষা ক্ষেত বা ফসলের মাঠ দেখতে পাবেন, জলরাশির দেখা মিলবে না। তাই বিলের পানির রূপ দেখতে এই সময়টি এড়িয়ে চলুন।
চলন বিল কিভাবে যাবেন
রাজধানী ঢাকা হতে চলন বিল যেতে হলে রাজশাহীগামী বাসে চড়ে নাটোরের কাছিকাটা নামক স্থানে নামলে সবচেয়ে সুবিধা হবে। ঢাকার থেকে ন্যাশনাল ট্রাভেল, গ্রামীণ ট্রভেলস দেশ ট্র্যাভেল, এভারগ্রীন ট্রান্সপোর্ট, একতা ট্রান্সপোর্ট, হানিফ এন্টারপ্রাইজ ও শ্যামলী পরিবহণের বাস নিয়মিত যাতায়াত করে। এসি/নন-এসি এসব বাসের ভাড়া লাগবে ৫৫০ থেকে ১৪০০ টাকা। নাটোরের কাছিকাটা থেকে চলন বিলের দূরত্ব প্রায় ১৩ কিলোমিটার। কাছিকাটা থেকে চাচকৈর বাজার হয়ে খুবজীপুর গ্রামে আসতে পারবেন। খুবজীপুর গ্রাম থেকে নাটোর অংশের চলন বিলের সৌন্দর্য সবচেয়ে ভালভাবে উপভোগ করা যায়। আর হাতে সময় থাকলে চলন বিল জাদুঘর ঘুরে জেনে নিতে পারেন চলন বিলের অজানা বিষয়াদি।
আর ঢাকা হতে ট্রেনে যেতে চাইলে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশান থেকে ধুমকেতু এক্সপ্রেস, একতা এক্সপ্রেস, সিল্কসিটি এক্সপ্রেস, সিরাজগঞ্জ এক্সপ্রেস, চিত্রা এক্সপ্রেস, লালমনি এক্সপ্রেস ও পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনে চড়ে শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশনে নামুন। শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরত্বে রয়েছে সিরাজগঞ্জ জেলা শহর। তবে ট্রেনে গেলে সহজে চলন বিলের সিরাজগঞ্জ অংশে যেতে পারবেন।
নাটোর কোথায় থাকবেন
চলন বিলের আশেপাশে থাকার মতো খুব ভালো মানের বিলাসবহুল রিসোর্ট এখনো গড়ে ওঠেনি। রাত্রিযাপনের জন্য আপনাকে নাটোর জেলা শহর অথবা সিরাজগঞ্জ শহরের আবাসিক হোটেলগুলোর ওপর নির্ভর করতে হবে। নাটোরে মুটামুটি মানের কতগুলো আবাসিক হোটেল ও বোডিং রয়েছে। হোটেল ভি.আই.পি এবং হোটেল রুখসানায় সিংগেল কেবিন ৩০০ থেকে ৪০০ ও ডাবল কেবিন ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা ভাড়ায় রাত্রিযাপন করতে পারবেন।
নাটোরে কি খাবেন
উদরপূর্তির জন্য নাটোরে বেশকিছু বিভিন্ন মানের রেস্টুরেন্ট রয়েছে। নিজের পছন্দ মত যেকোন রেস্টুরেন্টে সকাল, দুপুর ও রাতের খাবার খেতে পারবেন। সমগ্র বাংলাদেশে চলনবিল এবং রানী ভবানী সুস্বাদু মাছের সুনাম ছড়িয়ে আছে। তাই নাটোর ভ্রমনকালে মাছ খাওয়ার এই সুযোগ মিস করা মোটেও ঠিক হবে না। সাথে নাটোরের বিখ্যাত কাঁচাগোল্লা খেয়ে সাথে করে নিয়েও আসতে পারেন।
নাটোরের অন্যান্য দর্শনীয় স্থান
নাটোর (Natore) জেলার জনপ্রিয় ভ্রমণ স্থান গুলো হলো, উত্তরা গণভবন , দয়ারামপুর জমিদার বাড়ি, হালতি বিল , লালপুরের পদ্মার চর, বুধপাড়া কালীমন্দির ও ধরাইল জমিদার বাড়ি।