দর্শনীয় স্থান
বাংলাদেশের সেরা দর্শনীয় স্থানসমূহ আবিষ্কার করুন। প্রকৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অপূর্ব মিলনস্থল।

পলওয়েল পার্ক
রাঙ্গামাটি জেলা পুলিশের তত্ত্বাবধানে কাপ্তাই লেকের কোল ঘেঁসে তৈরি পলওয়েল পার্ক (Polwel Park) সৃজনশীলতার ছোঁয়ায় রাঙ্গামাটির অন্যতম সেরা বিনোদন কেন্দ্র হিসাবে স্থান করে নিয়েছে। বৈচিত্রময় ল্যান্ডস্কেপ, অভিনব নির্মাণশৈলী এবং নান্দ্যনিক বসার স্থান পার্কটিকে দিয়েছে ভিন্ন এক মাত্রা। নৈসর্গিক প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটাতে ও চিত্তবিনোদনের জন্য প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থীর পদচারণার পলওয়েল পার্ক মুখর হয়ে উঠে।

পৌনে তিন আনী জমিদার বাড়ি
শেরপুর জেলা সদরে অবস্থিত জমিদার সতেন্দ্র মোহন চৌধুরী ও জ্ঞানেন্দ্র মোহন চৌধুরীর বাড়িটি পৌনে তিন আনী জমিদার বাড়ি (Pone Ten Ani Jamidar Bari) হিসাবে সুপরিচিত। গ্রিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই বাড়িটি অন্যান্য জমিদার বাড়ি থেকে আলাদা। যদিও কালের বিবর্তনে জমিদার বাড়ির অনেক সৌন্দর্যই ম্লান হয়ে গিয়েছে তবে জমিদার বাড়ির চমৎকার নকশাকৃত দৃষ্টিনন্দন স্তম্ভগুলো আজো জমিদারী আমলের ঐতিহ্য বহন করে চলছে। স্তম্ভগুলো চতুষ্কোণ বিশিষ্ট এবং এতে বর্গাকৃতির ফর্ম ব্যবহার করা হয়েছে।

পোড়াবাড়ির চমচম
টাঙ্গাইলের বিখ্যাত পোড়াবাড়ির চমচমের (Porabari Chomchom) কথা শুনেনি এমন মানুষ হয়তো খুব কমই আছে। প্রায় দুইশ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য বজায় রেখে বানানো পোড়াবাড়ির চমচমের সুনাম রয়েছে বিশ্বজোড়া। সুস্বাদু ও লোভনীয় মিষ্টির রাজা হিসেবে খ্যাত ছানার তৈরি এই চমচমের স্বাদ নিতে দূর দূরান্ত থেকে মানুষ টাঙ্গাইলে ছুটে আসে। আর এই চমচমের গুণে সারাবিশ্বে টাঙ্গাইল জেলার রয়েছে এক অনন্য পরিচিতি।

পোড়াদহ মেলা
বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার ইছামতি নদী তীরবর্তী পোড়াদহ নামক স্থানে প্রতিবছর এক ঐতিহ্যবাহী লোকজ মেলার আয়োজন করা হয়। প্রায় ৪০০ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে আয়োজিত প্রাচীন এই মেলাটি পোড়াদহ মেলা (Poradaha Mela) নামে পরিচিত। বগুড়া শহর থেকে পোড়াদহ মেলা প্রাঙ্গণের দূরত্ব মাত্র ১১ কিলোমিটার।

প্রান্তিক লেক
বান্দরবান আর চট্টগ্রাম জেলার ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় শান্তভাবে লুকিয়ে আছে এই প্রান্তিক লেক। নামটি শুনলেই বোঝা যায় এটি দু’টি এলাকার প্রান্তে বা সীমারেখায় অবস্থিত, আর সেই থেকেই এর নাম প্রান্তিক লেক। এই লেকের পূর্ব তীর বান্দরবানের দিকে, আর পশ্চিম পাশে পড়ছে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া। মজার ব্যাপার হলো, সাতকানিয়ার দিকে একটি ছড়ায় বাঁধ দিয়েই তৈরি করা হয়েছে প্রায় ২৫ একর আয়তনের এই সুন্দর হ্রদটি। প্রান্তিক লেকের চারপাশের দৃশ্যটা আরও মনোরম। প্রায় ৬৫ একরেরও বেশি এলাকা জুড়ে রয়েছে ঘন বনাঞ্চল। চারপাশে পাহাড় আর অরণ্য ঘেরা, মাঝখানে নীলাভ জলাশয়, আর দূর থেকে ভেসে আসা নানা প্রজাতির পাখির কলতান, সব মিলে এখানে সৃষ্টি হয়েছে অপার্থিব এক আবহ।

তাড়াশ রাজবাড়ী
পাবনা জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বনমালী রায় বাহাদুরের তাড়াশ রাজবাড়ী (Tarash Rajbari) এই অঞ্চলের সবচেয়ে পুরাতন ও ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়ী হিসাবে সুপরিচিত। বগুড়া জেলার কোদলা গ্রামে তাড়াশের রায় বংশের পূর্বপুরুষ বাসুদেব অর্থাৎ তাড়াশ পরিবার জেলার সবচেয়ে বড় জমিদার ছিলেন। নবাব মুর্শিদকুলি খানের রাজস্ব বিভাগে চাকরি করে বাসুদেব তাড়াশ ভবন প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে বাসুদেব নবাব মুর্শিদকুলি খান কতৃক ‘রায়চৌধুরী’ খেতাবে ভূষিত হন। বাসুদেবের এষ্টেটে মৌজার পরিমাণ ছিল প্রায় ২০০টি।

বালিয়াডাঙ্গী সূর্য্যপূরী আমগাছ
ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার হরিণ মারি সীমান্তের মন্ডু মালা গ্রামে এমন ব্যতিক্রমী এক প্রাচীন আম গাছ রয়েছে যা দেখার জন্য মানুষের মধ্যে রয়েছে বিশেষ আগ্রহ। বালিয়াডাঙ্গী সূর্য্যপূরী আমগাছ (Surjapuri Mango Tree) নামে পরিচিত প্রায় ২০০ বছরেরও পুরনো এই আম গাছটি ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকার প্রায় ২.৫ বিঘা জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। ফলে এটি এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে বড় আম গাছের স্বীকৃতি পেয়েছে।

বাগেরহাট জাদুঘর
বাগেরহাট জেলার সুন্দরঘোনায় ষাট গম্বুজ মসজিদের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে পুরাতন রূপসা রোডে বাগেরহাট জাদুঘর (Bagerhat Museum) অবস্থিত। ১৯৭৩ সালে মুসলিম সংস্কৃতি ও খানজাহান আলীর স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক আবেদন জানানো হলে ১৯৯৫ সালে ইউনেস্কো-বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে ৫২০ বর্গ মিটার জায়গা জুড়ে এই জাদুঘরটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর বাগেরহাট জাদুঘর সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।

ভাগ্যকুলের মিষ্টি
মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার ভাগ্যকুল বাজার সুস্বাদু মিষ্টি ও ঘোলের জন্য সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে সুপরিচিত। আদি ও আসল স্বাদের সন্দেশ, ছানা, চমচমের মত বিভিন্ন মিষ্টান্ন খেতে চাইলে ভাগ্যকুল এক স্বর্গীয় স্থান। রকমারি মিষ্টির বাহার নিয়ে ভাগ্যকুলের বিভিন্ন মিষ্টান্ন ভান্ডারগুলো যেন আপ্যায়নের পসরা সাজিয়ে বসে আছে। এদের মধ্যে গোবিন্দ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার এবং চিত্তরঞ্জন মিষ্টান্ন ভান্ডার অতুলনীয় স্বাদের মিষ্টি ও ঘোলের জন্য সবচেয়ে প্রসিদ্ধ। যদিও ভাগ্যকুলের সকল দোকানেরই রয়েছে সমান সুনাম।

টেগর লজ
কুষ্টিয়া শহরের মিলপাড়ায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিমাখা লাল রঙের দোতলা কারুকার্যখচিত ‘টেগর লজ বা ঠাকুর লজ’ অবস্থিত। ১৮৯৫ সালে কবিগুরু টেগর এন্ড কোম্পানির ব্যবসায়িক কাজে কুষ্টিয়ায় এসে বর্তমান কালের সাক্ষী এই টেগর লজ (Tagore Lodge) ভবনটি নির্মাণ করেছিলেন।

তালুকদার বাড়ী
ভোলা জেলা থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে বোরহানউদ্দিন উপজেলার সাচড়া ইউনিয়নে ঐতিহাসিক তালুকদার জমিদার বাড়ি অবস্থিত। স্থানীয়দের কাছে বাড়ীটি দেউলা জিন্নাতুল্লা তালুকদার বাড়ি (Talukder Bari) হিসেবে সুপরিচিত। প্রায় ১৮০ বছর পূর্বে ভোলার ২৭টি মৌজার অধিকারী জমিদার বোরহানউদ্দিন এই বাড়িটি নির্মাণ করেন।

তামাবিল
সবুজ পাহাড় আর টিলায় ঘেরা সিলেট জেলা প্রকৃতির রূপে অনন্য। সিলেটের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেটকে সুন্দরী শ্রীভূমি আখ্যা দিয়েছিলেন। সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলায় অবস্থিত বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত তেমনি এক স্থানের নাম তামাবিল (Tamabil)। সিলেট-জাফলং রোড ধরে এগিয়ে যেতে থাকলে জাফলংয়ের ৫ কিলোমিটার পুর্বে তামাবিলের দেখা মিলবে। সিলেট জেলা থেকে তামাবিলের দূরত্ব প্রায় ৫৫ কিলোমিটার। তামাবিল মূলত বাংলাদেশের সিলেট এবং ভারতের শিলং মধ্যকার সীমান্ত সড়কের একটি চৌকি।

তেওতা জমিদার বাড়ি
তেওতা জমিদার বাড়ি (Teota Zamindar Bari) বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী প্রমীলা দেবীর স্মৃতি বিজড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। মানিকগঞ্জের (Manikganj) শিবালয় উপজেলার তেওতা জমিদার বাড়িতে কাজী নজরুল ইসলাম প্রমীলা দেবীর রূপে মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়/সেকি মোর অপরাধ’। কাজী নজরুল ইসলাম ও প্রমীলা দেবীর প্রেমের স্মৃতির সাক্ষী তেওতা জমিদার বাড়ির পাশেই ছিল প্রমীলা দেবীর পিতার বাড়ি। প্রমীলা দেবীর পিতা বসন্ত সেনের ভ্রাতুষপুত্র বীরেন সেনের সঙ্গে কবির সখ্যতার কারণে কবি তাঁদের বাড়িতে অবাধ যাতায়াত করতে পারতেন। লোকমুখে প্রচলিত তেওতা জমিদার বাড়িটির বয়স প্রায় ৩০০ বছর। মানিকগঞ্জ জেলার ইতিহাস থেকে পাওয়া তথ্য মতে, সপ্তদশ শতকের শুরুতে পাচুসেন নামের দরিদ্র কিশোর তামাকের ব্যবসায় বিপুল অর্থ-সম্পদ অর্জন করে দিনাজপুরের জয়গঞ্জে জমিদারী কিনে পঞ্চানন সেন নামে পরিচিতি লাভ করে। সেসময় মানিকগঞ্জের শিবালয়ের তেওতায় এই জমিদার বাড়ি নির্মাণ করেন।

টেংরাগিরি ইকোপার্ক
বরগুনা জেলার তালতলী উপজেলা থেকে ২৪ কিলোমিটার দূরে সোনাকাটা ইউনিয়নে সুন্দরবনের একাংশের বিশাল বনভূমি নিয়ে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য টেংরাগিরি ইকোপার্ক (Tengra Giri Eco Park) গড়ে তোলা হয়েছে। টেংরাগিরি ইকোপার্কের পাশে আরেকটি পর্যটন আকর্ষণ সোনাকাটা সমুদ্র সৈকত অবস্থিত। ১৯৬০ সালের ১২ জুলাই সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে ঘোষণাকৃত এই বনাঞ্চলটি স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে ফাতরার বন/পাথরঘাটার বন/হরিণঘাটার বন ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত হলেও ১৯৬৭ সালে বনাঞ্চলটিকে টেংরাগিরি বন হিসেবে নামকরণ করা হয়। সুন্দরবনের পর এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্বাসমূলীয় বনাঞ্চল, যা দিনে দুইবার জোয়ার ভাটায় প্লাবিত হয়। লবনাক্ত ও মিষ্টি মাটির অপূর্ব মিশ্রণের কারণে এই বনে রয়েছে বিলুপ্তি প্রজাতির অসংখ্য সারি সারি গাছ, পশু পাখি ও সরীসৃপ প্রাণী। টেংরাগিরির সবুজ ঘন ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, সৈকতের তটরেখায় লাল কাঁকড়াদের ছুটোছুটি, পাখির কলকাকলি ও শেষ বিকেলের দিগন্ত রেখায় সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য যেকোনো পর্যটকদের মুগ্ধ করার মতো। আর তাই তো নাগরিক কোলাহল এড়িয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সাগরের বিশালতার মাঝে হারিয়ে যেতে অনেকে ভ্রমণ পিপাসুরা দূর দূরান্ত থেকে এখানে ঘুরতে আসে।

তিস্তা ব্যারেজ
তিস্তা ব্যারেজ (Teesta Barrage) বা তিস্তা সেচ প্রকল্প বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহত্তম সেচ প্রকল্প। তিস্তা নদীর উপর নির্মিত তিস্তা ব্যারেজের একপাশে আছে লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলাধীন গড্ডিমারী ইউনিয়নের দোয়ানী গ্রাম এবং অন্য পাশে আছে নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলাধীন খালিসা চাপানী ইউনিয়নের ডালিয়া নামক স্থান। রংপুর, দিনাজপুর, নিলফামারী ও বগুড়া জেলার অনাবাদী জমিতে সেচ সুবিধা প্রদানের জন্য ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন সরকার তিস্তা ব্যারেজ তৈরীর পরিকল্পনা গ্রহণ করে। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে ৬১৫ মিটার দৈর্ঘ্যের ৪৪ রেডিয়াল গেট বিশিষ্ট ব্যারেজের নির্মাণ কাজ শুরু হয়, যা ১৯৯০ সালে শেষ হয়।

ঠাকুরপুর জামে মসজিদ
ঠাকুরপুর জামে মসজিদ (Thakurpur Jame Mosque) ঐতিহ্য আর নান্দ্যনিকতায় চুয়াডাঙ্গা জেলার একটি অন্যতম প্রাচীন ইসলামিক স্থাপত্য নিদর্শন। চুয়াডাঙ্গা থেকে ২ কিলোমিটার দূরে চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহ সড়কের পার্শ্ববর্তী ঠাকুরপুর গ্রামে অবস্থিত ঠাকুরপুর জামে মসজিদটি বর্তমানে পীরগঞ্জ জামে মসজিদ হিসেবে সুপরিচিত। মসজিদের মূল অংশ নির্মাণের ব্যাপারে প্রকৃত তথ্য পাওয়া না গেলেও স্থানীয় প্রবীণদের মতে, ১৬৯৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ থেকে সাধক পুরুষ হযরত আফু শাহ্ ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দ্যেশ্যে ঠাকুরপুরে এসে খানকা স্থাপন করেন। তিনি জীনদের সাহায্যে এক রাতের মধ্যেই মসজিদটি নির্মাণ করেন। একারণে স্থানীয় অনেকে এই মসজিদটি “জিনের মসজিদ” হিসেবে অভিহিত করেন।