দর্শনীয় স্থান
বাংলাদেশের সেরা দর্শনীয় স্থানসমূহ আবিষ্কার করুন। প্রকৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অপূর্ব মিলনস্থল।

ঋজুক ঝর্ণা
বান্দরবান জেলা সদর থেকে ৬৬ কিলোমিটার এবং রুমা বাজার থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে সাঙ্গু নদীর পাড়ে ঋজুক ঝর্ণা (Rijuk Waterfall) অবস্থিত। নদীপথে রুমা বাজার থেকে থানছি যাওয়ার সময় এই চির তরুণ ঋজুক ঝর্ণার দর্শন মিলে। মার্মা ভাষায় এই ঝর্ণার নাম রী স্বং স্বং। প্রায় ৩০০ ফুট উচু পাহাড় হতে সারা বছর জলধারা বয়ে চলে। আর বর্ষায় স্রোতের তোড় এত বৃদ্ধি পায় যে তখন জলপ্রপাতের কাছে ঘেঁষতে বড় ইঞ্জিনের নৌকা নিয়েও রীতিমত হিমশিম খেতে হয়। বছরজুড়ে বহমান জলের ধারা আর চারপাশের আদিম বুনো সবুজের সৌন্দর্য ঋজুক ঝর্ণাকে দিয়েছে প্রকৃতির এক অপার্থিব নির্মলতা।

রকস মিউজিয়াম
বাংলাদেশের একমাত্র পাথরের জাদুঘর বা রকস মিউজিয়াম (Panchagarh Rocks Museum) পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজ ক্যাম্পাসে স্থাপন করা হয়েছে। ১৯৯৭ সালে সম্পূর্ন ব্যক্তিগত উদ্যোগে অধ্যক্ষ নাজমুল হক এই পাথরের জাদুঘর গড়ে তোলেন। জাদুঘরে বিভিন্ন রং, আকৃতি এবং বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে পাথর সংরক্ষিত আছে। হাজার বছরের পুরনো পাথর ছাড়াও এখানে প্রাচীন ইমারতের ইট এবং পোড়ামাটির বিভিন্ন মূর্তি দেখতে পাওয়া যায়।

ক্যাথলিক গির্জা, সৈয়দপুর
নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে উত্তরাঞ্চলের সর্বপ্রথম ও প্রাচীনতম ক্যাথলিক গির্জা (Roman Catholic Church) অবস্থিত। ১৮৮৬ সালে সৈয়দপুর রেলওয়েতে কর্মরত অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ক্যাথোলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টানদের জন্য এই গির্জাটি নির্মাণ করা হয়। অতীতে সৈয়দপুর ব্যবসা ও বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল ছিল। ব্রিটিশ শাসনামলে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে স্থাপিত হলে সৈয়দপুরের গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়। রেলওয়ে ষ্টেশনের ঠিক উত্তর পাশেই একটি ছোট লোকোশেড স্থাপন করা হয় এবং লোকোশেডকে ঘিরে প্রায় ১১০ একর জায়গা জুড়ে রেলওয়ে কারখানা গড়ে তোলা হয়। রেলওয়ে কারখানায় বাঙ্গালী ও বিহারীদের পাশাপাশি রোমান ক্যাথোলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্ট সম্প্রদায়ের ব্রিটিশ ও অ্যাংলো ইন্ডিয়ান কাজ করতো। কর্মরত খ্রিষ্টানদের উপাসনার জন্য ব্রিটিশ সরকার সাহেব পাড়ার দুইপ্রান্তে রোমান ও ইউরোপীয় স্থাপত্য কলার সমন্বয়ে দুইটি গির্জা নির্মাণ করেন।

রণবিজয়পুর মসজিদ
বাগেরহাট জেলা থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে রণবিজয়পুর গ্রামে এক গম্বুজ বিশিষ্ট রণবিজয়পুর মসজিদ (Ronobijoypur Masjid) অবস্থিত। বাংলাদেশের এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদগুলোর মধ্যে সর্ববৃহৎ এই মসজিদটি স্থানীয়দের কাছে দরিয়া খাঁ’র মসজিদ হিসেবেও পরিচিত। ষাট গম্বুজ মসজিদ থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে পূর্ব দিকে রণবিজয়পুর মসজিদের অবস্থান। ধারণা করা হয়, ১৪৫৯ সালে হযরত খান জাহান আলীর আমলে হযরত খান জাহান আলীর সহচর দরিয়া খাঁ রণবিজয়পুর মসজিদ নির্মাণ করেন।

রুদ্রকর মঠ
শরীয়তপুর জেলায় অবস্থিত এক ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের নাম রুদ্রকর মঠ (Rudrakar Moth)। শরীয়তপুর জেলার একমাত্র মঠ রুদ্রকর মূলত একটি মন্দির। ধারণা করা হয়, নবাব আলীবর্দী খানের আমল অর্থাৎ ১৩০৫ থেকে ১৩১৫ বঙ্গাব্দে তৎকালীন জমিদার বাবু গুরুচরণ চক্রবর্তী মা রাশমণি দেবীর সমাধিকে অমর করে রাখার জন্য এই মন্দির নির্মাণ করেন। ১৮৯৮ সালে অনুপম স্থাপত্যশৈলীর এই মঠটি পূণনির্মাণ করা হয়।

সুলতান কমপ্লেক্স
নড়াইল জেলা সদর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে মাছিমদিয়া গ্রামে বিশ্ব বরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে সুলতান কমপ্লেক্স (S M Sultan Complex) নির্মাণ করা হয়েছে। ২০০৩ সালে চিত্রা নদীর মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রায় ২৭ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত সুলতান কমপ্লেক্সের চারপাশ দুর্লভ প্রজাতির বিভিন্ন সবুজ বৃক্ষে ঢাকা। অজশ্র পাখির কলতান মুখর করে রাখে এই কমপ্লেক্সের সবুজ প্রকৃতির মাঝে শায়িত এস এম সুলতানের সমাধিস্থল। সুলতান কমপ্লেক্সের দ্বিতল আধুনিক ফটোগ্যালারিতে শিল্পীর চিত্রকর্ম ও ব্যবহৃত জিনিসপত্র সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। প্রায় ৩৮ ফুট লম্বা আর্ট গ্যালারীতে সভ্যতার ক্রমবিকাশ, ধান মাড়াই, জমি কর্ষণ, গাঁতা চাষ সহ মোট ২৩টি ছবি রয়েছে। এস এম সুলতান শিশুদের ছবি আঁকা শিখানোর জন্য নদীতে বজরা নামের একটি “শিশু স্বর্গ” তৈরি করেছিলেন। বর্তমানে কমপ্লেক্স সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত শিশুস্বর্গে বাচ্চাদের ছবি আঁকা শেখানো হয়।

সাতৈর মসজিদ
ফরিদপুর জেলা সদর থেকে ২৩ কিলোমিটার দূরে বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর গ্রামে সুলতানী আমলের নয় গম্বুজ বিশিষ্ট সাতৈর মসজিদ (Satoir Mosque) অবস্থিত। ধারণা করা হয়, প্রায় ৭০০ বছর আগে শের শাহের আমলে সাতৈর গ্রামের আওলিয়া হযরত শাহ সুফি শায়েফ ছতুরি (রাঃ) পীরের প্রতি সম্মান প্রদর্শনপূর্বক ষোল শতকের দিকে আলা-উদ্দিন হুসাইন শাহ এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদ নির্মাণের কয়েক বছরের মধ্যে এটি পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়ায় মসজিদের চারপাশ জঙ্গলে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মসজিদটি সংস্কার ও পুনঃনির্মাণ করা হয়।

শৈলকুপা জমিদার বাড়ি
ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার আবাইপুর গ্রামে ঐতিহাসিক শৈলকুপা জমিদার বাড়ি অবস্থিত। বাংলা ১২শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে অবিভক্ত ভারতবর্ষের যশোর জেলার জমিদার রামসুন্দর শিকদার প্রায় ৪০০ বিঘা জায়গার উপর শৈলকুপা জমিদার বাড়ী স্থাপন করেন। দ্বিতল জমিদার বাড়ির চারদিকে ঘুরানো দালানসহ প্রায় ৩৫০টি কক্ষ ছিল। পরবর্তীতে রামচন্দ্র এখানে সাব-রেজিস্ট্রার অফিসসহ একটি বড় বাজার ও থিয়েটার হল স্থাপন করে তার জমিদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করেন, যা শিকদার স্ট্রীট হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

ষাইট্টা বটগাছ
ষাইট্টা ঢাকার ধামরাই (Dhamrai) উপজেলার যাদবপুর ইউনিয়নে অবস্থিত একটি গ্রাম। ষাইট্টা গ্রামের দেবীদাস বংশের পূর্বপুরুষরা প্রায় ৫০০ বছর আগে পাশাপাশি একটি পাকুড় গাছ এবং একটি বটগাছ রোপন করেন। স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীর লোকজন এই গাছ দুটিকে দেবতা মনে করেন। তাই তারা গাছের ছায়ার নিচে কালি মন্দির নির্মাণ করেছেন।

শমসের গাজীর সুড়ঙ্গ পথ
ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলার শুভপুরে শমসের গাজীর রাজকীয় বাগান বাড়ির পাশেই শমসের গাজীর সুড়ঙ্গ পথ (Shamsher Gazi’s Tunnel) অবস্থিত। ৩৫০ বছর পূর্বে ভাটির বীর হিসেবে পরিচিত শমসের গাজী ছিলেন ত্রিপুরা রাজ্যের রাজা, ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী নেতা ও ত্রিপুরার রোশনাবাদ পরগণার কৃষক বিদ্রোহের দূরদৃষ্টি সম্পন্ন নেতা।

শাপলা গ্রাম, সাতলা
শাপলা গ্রাম সাতলা (Shapla Gram Satla) যেন এক শাপলার রাজ্য। বিলের পানিতে ফুটে থাকা হাজারো লাল শাপলা যেন সূর্য্যের লাল আভাকেও হার মানায়। বরিশাল (Barishal) সদর থেকে সাতলা গ্রামের দূরত্ব ৬০ কিলোমিটার। বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলা গ্রামের বিলগুলো স্থানীয়দের কাছে শাপলার বিল নামে পরিচিত। এখানে কবে থেকে শাপলা ফোটা শুরু হয়েছে এ তথ্য পাওয়া না গেলেও জানা যায় এখানে লাল, সাদা আর বেগুনি এই তিন ধরণের শাপলা জন্মে। তবে লাল শাপলা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

শাহপরীর দ্বীপ
বাংলাদেশের মূল ভূখন্ডের সর্ব দক্ষিণে শাহপরীর দ্বীপ (Shapuree Island/Shah Porir Dwip) অবস্থিত। এটি কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের একটি গ্রাম। টেকনাফ থেকে শাহপরীর দ্বীপের দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। মাত্র ৪০ হাজার জনসংখ্যার এই দ্বীপের মানুষের মাছধরা ও লবণ চাষ হচ্ছে প্রধান পেশা। এই দ্বীপে হাট-বাজার, স্কুল-মাদ্রাসা, মসজিদ ইত্যাদি সবই রয়েছে। প্রচলিত আছে বর্তমানে মূল ভূ-খণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও অতীতে এটি ছিল একটি দ্বীপ।

শিমুল বাগান
শিমুল বাগান (Shimul Bagan) সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদীর নিকটবর্তী মানিগাঁও গ্রামে অবস্থিত। প্রায় ১০০ বিঘা জায়গা জুড়ে গড়ে তোলা এই শিমুল বাগানে আছে প্রায় ৩ হাজার শিমুল গাছ। ২০০৩ সালের দিকে স্থানীয় ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদীন এই বাগান শুরু করেন। তাঁর নাম অনুসারেই এই জায়গার নাম জয়নাল আবেদীন শিমুল বাগান।

সোনাবাড়িয়া মঠবাড়ি মন্দির
সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলায় অবস্থিত সোনাবাড়িয়া মঠবাড়ি মন্দির বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। সাতক্ষীরা থেকে ২৬ এবং কলারোয়া থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে সোনাবাড়ীয়া গ্রামে সোনাবাড়িয়া মঠবাড়ি মন্দিরটির অবস্থান। স্থনীয়দের কাছে সোনাবাড়ীয়া মঠ এবং শ্যাম সুন্দর মন্দির নামেও পরিচিত। তবে সোনাবাড়িয়া মঠবাড়ি মন্দিরের দেয়ালের শিলালিপিতে শ্যাম সুন্দর নবরত্ন মন্দির নামের উল্লেখ পাওয়া যায়।

সোমেশ্বরী নদী, দুর্গাপুর
সোমেশ্বরী নদী (Someshwari River) ও তার সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে যেতে হবে নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলায়। ভারতের মেঘালয়ের গারো পাহাড়ের সীমসাংগ্রী নামক স্থান থেকে উৎপন্ন হয়ে সোমেশ্বরী নদীটি দুর্গাপুরে প্রবেশ করেছে। লোকমুখে প্রচলিত অনেককাল আগে সোমেশ্বর পাঠক নামে এক ব্যক্তির দ্বারা এ অঞ্চল দখল হয়ে যায়, পরবর্তীতে তার নামানুসারেই নদীটি সোমেশ্বরী নদী হিসাবে পরিচিতি পায়। বছরের ভিন্ন ভিন্ন সময় সোমেশ্বরী নদী একেক রকম সৌন্দর্য মেলে ধরে। শীতকালে পানি কমে গেলেও সদা স্বচ্ছ জলের সোমেশ্বরী নদী বর্ষায় যেন যৌবন ফিরে পায়। বর্তমানে কয়লা খনি হিসেবে অধিক পরিচিত হলেও সোমেশ্বরী নদী সৌন্দর্য্যে একটুও ভাটা পরেনি।

সোনারচর
পটুয়াখালী জেলায় অবস্থিত নয়ানাভিরাম একটি সমুদ্র সৈকতের নাম সোনারচর (Sonarchar)। পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলা থেকে সোনারচরের দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার। সাগরের মাঝে অবস্থিত সোনারচর দ্বীপের দুর্গম ও বিপদসঙ্কুল যোগাযোগ ব্যবস্থা যেন সৌন্দর্য পাগল পর্যটকদের অদম্য ইচ্ছার কাছে হার মেনেছে। তাই অনেকেই প্রকৃতির রূপ দেখতে ছুটে যান সোনারচরে। চঞ্চল সাগরের ঢেউ, জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য, সৈকত জুড়ে লাল কাঁকড়ার অবাধ বিচরণ এবং জীববৈচিত্রপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল পর্যটকদের মোহিত করে আপন মহিমায়।