দর্শনীয় স্থান
বাংলাদেশের সেরা দর্শনীয় স্থানসমূহ আবিষ্কার করুন। প্রকৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অপূর্ব মিলনস্থল।

লামাপাড়া খিয়াং
কক্সবাজার জেলার ফতেখারকুল ইউনিয়নে রামু চৌমুহনী বাসস্ট্যান্ড থেকে ১ কিলোমিটার দূরে বাকখালী নদীর তীরে লামাপাড়া খিয়াং (Lamapara Khiang) অবস্থিত। উনিশ শতকের শুরুর রামুর থু অং গিয়াও চৌধুরী লামাপাড়া খিয়াং নির্মাণ করেন। লামাপাড়া খিয়াংয়ে মার্বেল পাথরের মঞ্চের উপর স্থাপিত পিতলের বুদ্ধ মূর্তি আকারের দিক দিয়ে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহৎ বুদ্ধ মূর্তি হিসাবে স্বীকৃত। খিয়াংয়ের স্থাপত্যশৈলী আগত দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। কক্সবাজার জেলার প্রায় সকল থানায় এই ধরনের খিয়াং রয়েছে। এদের মধ্যে কেবল মাত্র রামুতে প্রায় ২৩টি খিয়াং রয়েছে।

মাধবপুর লেক
মাধবপুর লেক (Madhabpur Lake) বা হ্রদটি মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নে অবস্থিত। কমলগঞ্জ উপজেলা সদরে থেকে মাধবপুর লেকের দূরত্ব ৫ কিলোমিটার। ১৯৬৫ সালে চা বাগানের টিলায় বাঁধ দিয়ে পানি জমিয়ে এই লেক তৈরী করা হয়। প্রায় ৫০ একর আয়তনের মাধবপুর হ্রদের দৈর্ঘ্য ৩ কিলোমিটার এবং স্থান বিশেষে প্রস্থ ৫০ থেকে ৩০০ মিটার পর্যন্ত।

মধুমতি নদী
মধুমতি নদী (Madhumati River) বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মাগুরা, ফরিদপুর, নড়াইল, গোপালগঞ্জ ও বাগেরহাটের উপর দিয়ে প্রবাহিত পদ্মা নদীর একটি শাখা। মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার নাকোল ইউনিয়নে প্রবহমান গড়াই নদী হতে সৃষ্টি হয়ে মাগুরা- ফরিদপুর জেলার সীমানা ঘেঁষে প্রবাহিত হয়ে মধুমতি নামে নড়াইল ও খুলনা জেলার আঠারবেকিতে বাগেরহাট জেলায় প্রবেশ করে বরিশালের হয়ে হরিণঘাটা মোহনার কাছে বঙ্গোপসাগরের সাথে মিলিত হয়েছে।

মাগুরার ভাতের ভিটা
মাগুরা সদর উপজেলা থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে ফটকি নদীর উত্তর তীরবর্তী টিলা গ্রামে অবস্থিত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার নাম ভাতের ভিটা (Vater Vita)। ধারণা করা হয়, প্রায় ৩২১ খিস্টপূর্বে মৌর্য্য সাম্রাজ্যের তৃতীয় শতাব্দী থেকে গুপ্ত সাম্রাজ্যের সময়কাল পর্যন্ত টিলা গ্রামে একটি বৌদ্ধ সংঘ্যারাম প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল। সেই সময় এই অঞ্চলের শাসনকার্য পরিচালনা করার লক্ষ্যে একটি বিচারালয় ও অপরাধীদের সাজা দেওয়ার লক্ষ্যে টিলা গ্রামের পশ্চিমে একটি উঁচু জায়গা নির্মাণ করা হয়। স্থানীয়ভাবে এই স্থানটি ছোট টিলা বা ভাতের ভিটা নামে পরিচিতি পায়। বন্যায় সারাদেশের বিভিন্ন স্থান প্লাবিত হলেও টিলা গ্রামটি কখনো প্লাবিত হয় না। তবে স্থানীয়দের মতে, আধ্যাত্মিক এক দরবেশ এই ভিটা নির্মাণ করেছেন এবং সেই কারণে স্থানটি একটি পুণ্যস্থান হিসেবে বিবেচিত।

মারায়ন তং
বান্দরবান জেলার আলীকদম থানার মিরিঞ্জা রেঞ্জে অবস্থিত একটি পাহাড়ের নাম মারায়ন তং (Marayan Dong)। এই পাহাড় আরও কয়েকটি নামে পরিচিত যেমন; মারায়ান তং, মারায়ং তং, মেরাই থং জাদি, মারাইং ডং ইত্যাদি। প্রায় ১৬৪০ ফুট উচ্চতার এই পাহাড়ের চূড়ায় আছে একটি বৌদ্ধ উপাসনালয়। খোলা প্রকৃতির মাঝে বৌদ্ধের বিশাল মূর্তি এই জায়গাটিকে আরও গাম্ভির্যময় করে তোলেছে। দিগন্তজোড়া পাহাড় আর নিচে সাপের মতো বয়ে চলা মাতামুহুরী নদী, ফসলের ক্ষেত সবকিছু মিলিয়ে এ যেন এক কল্পনার রাজ্য।

বঙ্গবন্ধুর সমাধি সৌধ
গোপালগঞ্জ জেলা সদর থেকে মাত্র ১৯ কিলোমিটার দূরে টুঙ্গীপাড়া গ্রামে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রবাদপুরুষ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি সৌধটি (Mausoleum of Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman) অবস্থিত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ টুঙ্গীপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকের বুলেটে বঙ্গবন্ধুর আন্দোলন-সংগ্রাম-ময় বর্ণাঢ্য জীবনের অবসান ঘটে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মরদেহ পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর মা-বাবার কবরের পাশে সমাহিত করা হয়।

মাওয়া ফেরি ঘাট
মাওয়া ফেরি ঘাট (Mawa Feri Ghat) পর্যটকদের জন্যে নদী ভ্রমণ এবং ইলিশ ভোজন এর জন্যে জনপ্রিয় একটি জায়গা। মাওয়া ফেরি ঘাটের পাড়ে রয়েছে বেশকিছু খাবার হোটেল। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ইলিশ খাওয়ার জন্য অনেকেই মাওয়া ঘাটে ছুটে আসেন। এখানকার মাছের বাজারে ইলিশ ছাড়াও অনেক বাহারি প্রজাতির তাজা মাছ পাওয়া যায়।

মিঠামইন হাওর
মিঠামইন (Mithamoin) কিশোরগঞ্জ জেলার একটি উপজেলা। মিঠামইন এর উত্তরে ইটনা ও আজমিরিগঞ্জ উপজেলা, দক্ষিণে অষ্টগ্রাম উপজেলা, পূর্বে বানিয়াচং ও অষ্টগ্রাম, পশ্চিমে করিমগঞ্জ ও নিকলী উপজেলা। হাওর এলাকা হলেও এটি একটি প্রাচীন জনপদ। মিঠামইনকে অন্যান্য নামেও ডাকা হয় তার মধ্যে মিঠামন, মিটামইন বা মিটামন বলে উচ্চারণ করে থাকেন। নামের উৎস নিয়ে যে মত আছে তার একটি হলো গ্রামের পাশ্ববর্তী এলাকায় এক সময় প্রচুর মিষ্টি বা মিঠা রসের খাগড়া গাছের বন ছিল। এই খাগড়ার বন থেকে মিঠাবন এবং সেখান থেকে মিঠামন বা মিঠামইন হয়েছে।

মোংলা বন্দর
মোংলা বন্দর বা মোংলাপোর্ট (Mongla Port) খুলনা বিভাগের বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলার সেলাবুনিয়া মৌজায় পশুর ও মোংলা নদীর সংযোগস্থলে অবস্থিত। ১৯৫০ সালের ১ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত মোংলা বন্দর বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্র বন্দর। খুলনা থেকে মোংলা বন্দরের দূরত্ব ৪৮ কিলোমিটার। বন্দরটি বঙ্গোপসাগর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। মোংলা পোর্টটি অন্যান্য অভ্যন্তরীণ নদী বন্দর ও খুলনায রেল টার্মিনালের সাথে সংযুক্ত রয়েছে।

মতিরহাট সৈকত
অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্যের জন্য লক্ষ্মীপুরের মতিরহাট সৈকত (Motirhat Beach) ইতিমধ্যে পর্যটকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। কমলনগরের মেঘনা নদীর তীরে মতিরহাট সৈকতের অবস্থান। মেঘনার ভাঙন থেকে ভূমি বাঁচাতে তৈরি করা মতিরহাট বাজার রক্ষা বাঁধ নির্মাণের ফলে প্রাকৃতিক ভাবে প্রায় দুই কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত অপুর্ব এক বেলাভূমির জন্ম হয়। বেলাভূমির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে অনেকেই একে ‘মতির হাট মেঘনা সৈকত’ ও ‘মিনি কক্সবাজার’ নামে আখ্যায়িত করেছেন।

ময়না দ্বীপ
ময়মনসিংহ শহর থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ব্রহ্মপুত্র নদীতে জেগে উঠা ব-দ্বীপটি ময়নার চর বা ময়না দ্বীপ (Moyna Deep) হিসেবে পরিচিত। একদিকে স্বচ্ছ জলের খেলা এবং অন্য দিকে বাণিজ্যিক ভাবে চাষকৃত বিশাল লেবু বাগান নিয়ে ছায়া সুনিবিড় ময়না দ্বীপ যেন সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে বসে আছে। জানা যায়, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের কর্মী ময়না মিয়া এখানে বাস করতো। অবসরে গাছের তলায় বসে তিনি বাঁশি বাজিয়ে সময় কাটাতেন। বাঁশির সুমধুর সুর শুনে অনেকেই ময়না মিয়ার সাথে দেখা করতে আসতো। ময়না মিয়া তাদেরকে ব্রিটিশদের তাড়ানোর নানা বুদ্ধি শিখিয়ে দিতেন। এভাবে আস্তে আস্তে লোকে মুখে এই চরের নাম হয়ে গেল ময়না চর বা ময়না দ্বীপ। আবার অনেকের মতে একসময় এই চরে প্রচুর ময়না পাখির বসবাস ছিল সে থেকেই এমন নামকরন করা হয়েছে।

মুছাপুর ক্লোজার
নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মুছাপুর ইউনিয়নে বঙ্গোপসাগর ও ফেনী নদীর মোহনায় নির্মিত মুছাপুর ক্লোজার (Muchapura/Musapur Closure) মিনি কক্সবাজার বা মুছাপুর সমুদ্র সৈকত হিসেবে সুপরিচিত। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে মুছাপুর ক্লোজার অন্যতম প্রিয় গন্তব্য। নৈসর্গিক প্রাকৃতিক পরিবেশ, নদীর বুকে সুর্যাস্থের দৃশ্য, জোয়ার-ভাটা এবং জেলেদের কর্মময় ব্যস্থতা আগত দর্শনার্থীদের বিনোদিত করে। মুছাপুর ক্লোজার এলাকায় ফেনী নদী পাড় দেখতে সাগর সৈকতের চেয়ে কোন অংশে কম নয়।

রহনপুর নওদা বুরুজ
চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরে গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুরে প্রাচীন ইতিহাস সমৃদ্ধ নওদা বুরুজ (Naoda Buruz) অবস্থিত। দূর থেকে নওদা বুরুজ দেখতে অনেকটা মাটির উঁচু ঢিবির মতো, যা স্থানীয়দের কাছে ষাঁড়বুরুজ পরিচিত। তবে এই অট্টালিকার প্রকৃত নাম শাহুরুজ। শাহ শব্দের অর্থ বাদশা ও বুরুজ শব্দের অর্থ অট্টালিকা। ইতিহাস বিখ্যাত নদীয়া অঞ্চলের কাছে হওয়ায় এই স্থাপনাটি নওদা নামে পরিচিতি লাভ করে।

নরসুন্দা লেকসিটি ও মুক্তমঞ্চ
কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের বুক চিরে বয়ে চলা নরসুন্দা নদীকে কেন্দ্র করে নরসুন্দা লেকসিটি (Narashunda Lake City) গড়ে তোলা হয়েছে। কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের প্রাণ, নানা উপাখ্যানের সাক্ষী এক সময়ের খরস্রোতা এই নদীকে নবজীবন প্রদান এবং পৌর নাগরিকদের জীবন মান বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে গৃহীত নরসুন্দা লেকসিটি প্রকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসাবে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে ৫টি দৃষ্টিন্দন সেতু ও ২টি ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। নদীর দুই পাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ এবং হাঁটাচলা করার জন্য তৈরি করা হয়েছে সুপরিসর ওয়াকওয়ে।

নজরুল স্কয়ার
চট্টগ্রাম শহরের জিরো পয়েন্টের কাছে নন্দনকান বৌদ্ধ মন্দির সড়কে অবস্থিত ডিসি হিল/ডিসির পাহাড়ের বর্তমান নাম নজরুল স্কয়ার (Nazrul Square)। চারপাশে সুউচ্চ গাছগাছালিতে ঘেরা এই পাহাড়ের চূড়ায় চট্টগ্রাম জেলা কমিশনারের সরকারী বাসভবন রয়েছে। ইংরেজ শাসনামলে শুরুর দিকে এই পাহাড়ের চূড়ায় চাকমা রাজার বাড়ি ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এখানে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের বাংলো তৈরী করা হলে পাহাড়টি ডিসি হিল নামে পরিচিত হয়ে উঠে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রায়শই এখানে অবসর সময় কাটাতে আসতেন। তাঁর এই আগমনকে অম্লান করে রাখতে ২০০৫ সালের ১০ এপ্রিল ডিসি হিলের নাম পরিবর্তন করে নজরুল স্কয়ার রাখা হয়।

নীলাচল
নীলাচল (Nilachal) পর্যটন কেন্দ্র বান্দরবান শহর থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরে সমুদ্রপৃষ্ট থেকে প্রায় দুই হাজার ফুট উচ্চতায় টাইগার পাড়ায় পাহাড়ের উপর অবস্থিত। নীলাচলে রয়েছে আকাশ, পাহাড় আর মেঘের অপূর্ব মিতালী আর তুলনাহীন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য। সকালে মেঘের ভেলার খেলা আর বিকেলের সূর্যাস্ত এই দুইটি সময়ই নীলাচল তার পূর্ণ রূপ ধারণ করে। নীলাচল থেকে পুরো বান্দরবান শহরকে দেখা যায় আবার মেঘমুক্ত আকাশ থাকলে দূরের কক্সবাজার সাগর সৈকত হাতছানী দেয় পর্যটকদের। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা রাস্তা সমানভাবে বিমোহিত করে পর্যটকদের। নীলাচলে বর্ষা, শরৎ আর হেমন্তকালে হাতের কাছে মেঘ খেলা করে। নীলাচলের একেক স্থান থেকে একেক রকম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করা যায়।