দর্শনীয় স্থান
বাংলাদেশের সেরা দর্শনীয় স্থানসমূহ আবিষ্কার করুন। প্রকৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অপূর্ব মিলনস্থল।

ডিবির হাওর
ডিবির হাওর ( Dibir Haor ) সিলেটের জৈন্তাপুরে বাংলাদেশ ভারত সীমান্ত ঘেঁষা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। সিলেট শহর থেকে ডিবির হাওরের দূরত্ব ৪২ কিলোমিটার। ইয়াম, ডিবি, হরফকাটা, কেন্দ্রী বিল নামে এখানে মোট চারটি বিল রয়েছে। বর্ষাকালের পর বিলগুলো শাপলার রাজ্যে পরিণত হয়। তখন সমস্ত বিল জুড়ে হাজার হাজার লাল শাপলা ছড়িয়ে থাকে। ভোরে হাজারো লাল শাপলা আলোকিত করে রাখে চারপাশ। প্রকৃতি যেন আপন ইচ্ছের মাধুরীতে লাল শাপলার হাসিতে বিলগুলোকে সাজিয়ে দেয় পরম মমতায়। যেকোনো ভ্রমণপিপাসুদের সারাজীবন মনে রাখার জন্য শাপলা বিলে একটি সকালই যথেষ্ট। ডিবির হাওর তাই শাপলা বিল নামেও সবার কাছে পরিচিতি লাভ করেছে। এছাড়া এখানে প্রায় দুইশত বছরের পুরাতন একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দির রয়েছে। কথিত আছে, জৈন্তা রাজ্যের কোন এক রাজাকে ডিবির হাওরে কোথাও পানিতে ডুবিয়ে মারা হয়েছিল। ধারণা করা হয় তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে এ মন্দির নির্মিত হয়েছে। এছাড়া হরফকাটা ও ডিবি বিলের মধ্যস্থলে রাজা রাম সিংহের সমাধিস্থল রয়েছে। শীতকালে এই হাওর জুড়ে অথিতি পাখিদের রাজত্ব শুরু হয়। তখন সাদাবক, জলময়ুরী ও পানকৌড়ি ইত্যাদি বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখির কলরবে মুখর হয়ে থাকে ডিবির হাওরের চারপাশ।

ডিম পাহাড়
বান্দরবানের আলীকদম এবং থানচি থানার মাঝখানে ডিম পাহাড়ের অবস্থান। বাংলাদেশের সবচেয়ে উচু সড়ক হিসাবে পরিচিত থানচি-আলীকদম সড়ক। এই সড়ক পথেই ডিম পাহাড় (Dim Pahar) এর অবস্থান। অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় ভ্রমণকারীদের কাছে এই রাস্তা এবং ডিম পাহাড় বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং বৈচিত্র্যময় আদিবাসী জীবনধারায় পরিপূর্ণ ডিম পাহাড় দিয়েই আলীকদম ও থানচি থানার সীমানা নির্ধারন করা হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ আলীকদম-থানচি সড়ক নির্মাণের ফলে বর্তমানে ডিম পাহাড়ে গমন সহজতর হয়েছে।

দিনাজপুর রাজবাড়ী
দিনাজপুর শহরের খুব কাছে অবস্থিত দিনাজপুর রাজবাড়ী (Dinajpur Rajbari) অত্র জেলার ইতিহাস ও ঐশ্বর্যের প্রতীক হিসাবে পরিগণিত হয়ে আসছে। ১৯৫১ সালে জমিদারী প্রথার বিলুপ্তির পর থেকে দিনাজপুর রাজবাড়ীর জৌলুশে ভাটা পড়তে থাকে। দিনাজপুর রাজবাড়ীর সর্বশেষ জমিদার জগদীশনাথ ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। বর্তমানে এই রাজবাড়িটি কালের সাক্ষী হিসাবে টিকে আছে।

ডিঙ্গাপোতা হাওর
নেত্রকোণা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত ডিঙ্গাপোতা হাওর (Dingapota Haor) দেশের বৃহত্তম হাওরগুলোর মধ্যে অন্যতম। ঋতুভেদে ভিন্ন ভিন্ন নবরূপে এই হাওরের সৌন্দর্য ফুটে উঠে। বর্ষাকালে হাওরের অথৈ জলের ধারা, শুষ্ক মৌসুমে চারপাশের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য সবকিছুই প্রকৃতিপ্রেমী দর্শনার্থীদের মোহিত করে। তবে সকল মৌসুমেই হাওরের বিশাল জলরাশির গভীরতম স্থানে থাকা আধডোবা হিজল গাছ, জলরাশির উচ্ছল ঢেউ ও নীল আকাশের মিতালী চোখে পরে। বিশেষ করে শরৎ ও হেমন্তকালে হাওরের দুপাড়ের সবুজ সোনালি ধানক্ষেত ও নীলচে আকাশের সৌন্দর্য দর্শনার্থীদের সবচেয়ে বেশী আকর্ষণ করে।

দীপশিখা স্কুল
দিনাজপুর জেলা থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে বিরল উপজেলার রুদ্রপুরে অবস্থিত দীপশিখা স্কুল (Dipshikha School) মাটির তৈরি একটি ভিন্নধর্মী বিদ্যানিকেতন। স্থানীয় মানুষের ঐতিহ্য ও পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে এই বিদ্যালয়ে। রুদ্রপুর গ্রামের শিশুদের প্রায় ৭ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতে হতো। ফলে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশুনা বাদ দিয়ে কৃষি বা অন্যান্য কাজে জড়িয়ে পড়ত। ২০০২ সালে রুদ্রপুর গ্রামে গবেষণার কাজে অস্ট্রেলিয়ার লিজ ইউনিভার্সিটি থেকে Anna Herigar সহ আরো ১০ জন শিক্ষার্থী আসেন। গবেষণা শেষে অন্যরা ফিরে গেলেও Anna Herigar তাঁর গবেষণা ও স্থাপত্যবিদ্যা কাজে লাগিয়ে রুদ্রপুরের অনুন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা প্রসারের লক্ষ্যে একটি স্কুল বানানোর পরিকল্পনা করেন। তাঁর এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে আসে জার্মানির উন্নয়ন সংস্থার আধুনিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট এবং বাংলাদেশের বেসরকারি সেবা সংস্থা দীপশিখা। যার ফলশ্রুতিতে ২০০৬ সালে METI Handmade School নির্মাণ করা হয়।

ডাবল হ্যান্ড ভিউ পয়েন্ট
ডাবল হ্যান্ড ভিউ পয়েন্ট (Double Hand View Point) বান্দরবান জেলার বান্দরবান-থানচি রোডে নীলগিরির কাছেই অবস্থিত একটি ভিউ পয়েন্ট। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ, সবুজে মোড়া প্রকৃতি আর মেঘের খেলা মিলিয়ে বান্দরবানের প্রতিটি ভিউ পয়েন্ট ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য এক স্বর্গীয় অভিজ্ঞতা। এর মধ্যে ডাবল হ্যান্ড ভিউ পয়েন্ট একটি জনপ্রিয় গন্তব্য।

দয়াময়ী মন্দির
দয়াময়ী মন্দির (Doyamoyee Temple) জামালপুর জেলা শহরের জিরো পয়েন্টে অবস্থিত একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। ১৬৯৮ খ্রিস্টাব্দে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর আমলে শ্রীকৃষ্ণ রায় চৌধুরী এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় ৬৫ শতাংশ জমির উপর নির্মিত দয়াময়ী মন্দিরে আলাদাভাবে শিব, কালি, নাটমন্দির এবং মনসা দেবীর মন্দির স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া দয়াময়ী মন্দিরে শতবর্ষ পুরনো কারুকার্য খচিত বিভিন্ন দৃষ্টিনন্দন চিত্রকর্ম রয়েছে।

একডালা দুর্গ
আনুমানিক ৬০০ খ্রিষ্টাব্দে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে শীতলক্ষ্যা এবং ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম দিকে জনৈক হিন্দু রাজা ৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং ২ কিলোমিটার প্রস্থ বিশিষ্ট একডালা দুর্গ (Ekdala Fort) নির্মাণ করেন। ১৩৫২ খ্রিষ্টাব্দে ইলিয়াস শাহ দিল্লীর সুলতান ফিরোজ তুঘলকের সাম্ভাব্য আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দুর্গটি সংস্কার করেন। ১৩৫৩ এবং ১৩৫৭ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লীর সুলতান ফিরোজ তুঘলক দুইবার একডালা দুর্গ আক্রমণ করেও দুর্গটি দখল করতে পারেননি।

উপজাতীয় কালচারাল একাডেমী
নেত্রকোনা জেলা থেকে ৩৭ কিলোমিটার দূরে দূর্গাপুরের বিরিশিরিতে স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান উপজাতীয় কালচারাল একাডেমী (Ethnic Cultural Academy) অবস্থিত। মূলত বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে বসবাসরত হাজং, কোচ, ডালু, মান্দাই, বানাইসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করার লক্ষ্য নিয়ে উপজাতীয় কালচারাল একাডেমী প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

ফরিদপুর পৌর শেখ রাসেল শিশুপার্ক
ফরিদপুর জেলা শহরের গোয়ালচামট নামক স্থানে প্রায় ১৪ একর জায়গাজুড়ে ওয়ান্ডারল্যান্ড এবং ফরিদপুর পৌরসভার যৌথ উদ্যোগে ফরিদপুর পৌর শেখ রাসেল শিশুপার্ক (Faridpur Poura Sheikh Rasel Shishu Park) নির্মাণ করা হয়েছে। ২০১৪ সালে নির্মিত পৌর শেখ রাসেল শিশুপার্কটিতে আছে চলন্ত ট্রেন, ভূতুরে গুহা, ওয়ান্ডার হুইল, সুইং কেয়ার, প্যারাট্যুপার, বোট রাইডিং সহ ৩০ টিরও অধিক আকর্ষণীয় রাইড, লেক, মিনি চিড়িয়াখানা, ভিডিও গেমস, ফুড কর্ণার এবং পিকনিক স্পট।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরালয়
বিভাগীয় শহর খুলনা থেকে মাত্র ১৯ কিলোমিটার দূরত্বে ফুলতলা উপজেলার দক্ষিণডিহি গ্রাম অবস্থিত। দক্ষিণডিহি গ্রামেই রয়েছে একসময়ের জাঁকজমকপূর্ণ রায় বাড়ি তথা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরালয়। বর্তমানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরালয় (Father-In-Law’s House of Rabindranath) ‘রবীন্দ্র কমপ্লেক্স’ নামে পরিচিত। এখানে রয়েছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কবিপত্নী মৃণালিনী দেবীর আবক্ষ ভাস্কর্য এবং মূল দ্বিতল ভবন। এছাড়াও ঘন সবুজ বাগান, পুকুরঘাট, পান বরজ এবং সুসজ্জিত নার্সারি এই বাড়িটির শোভাবর্ধন করেছে।

ভাসমান পেয়ারা বাজার
ঝালকাঠি, বরিশাল এবং পিরোজপুরের সিমান্তবর্তী এলাকায় গড়ে উঠেছে এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম পেয়ারা বাগান। ঝালকাঠী জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে ভিমরুলিতে রয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভাসমান পেয়ারা বাজার (Floating Guava Market) । তিন দিক থেকে আসা খালের মোহনায় বসে ভিমরুলির এই ভাসমান পেয়ারা বাজার। জুলাই, আগস্ট পেয়ারার মৌসুম হলেও মাঝে মাঝে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাজার চলে। ভাসমান পেয়ারা বাজার দেখতে আগস্ট মাস সবচেয়ে উপযোগী সময়। সকাল ১১ টার পর পেয়ারা বাজারের ভীড় কমতে থাকে তাই ১১ টার আগে বাজারে যাওয়াই সবচেয়ে ভাল।

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি ফলক
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় কুড়িগ্রামে পাকিস্থানি হানাদার বাহিনী কতৃক বর্বোরোচিত হামলায় শহীদদের স্মরণে কুড়িগ্রাম শহরের ঘোষপাড়ায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি ফলক (Freedom Fighter Memorial Block) নির্মাণ করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের পর পাকিস্থানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সমগ্র বাংলাদেশের সাথে কুড়িগ্রামবাসীও উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছিল। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ৩১ মার্চ কুড়িগ্রামের স্থানীয় পুলিশ, আনসার, ছাত্র-জনতা ও ইপিআরদের নিয়ে একটি সম্মেলিত বাহিনী গড়ে তোলা হয়। কয়েক দফায় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাকিস্থানি বাহিনীর মুখোমুখি গুলি বর্ষণে বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়। পরবর্তীতে পাকিস্থানি বাহিনী ও রাজাকাররা কুড়িগ্রাম ছেড়ে লালমনিরহাট দখলের উদ্দেশ্যে চলে গেলে মুক্তিযোদ্ধারা কুড়িগ্রামের জনসাধারণকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।

ফানসিটি শিশু পার্ক
ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ পৌরসভা কার্যালয়ের সামনে প্রায় ১০ একর জায়গা জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন ফানসিটি শিশু পার্ক (Funcity Amusement Park)। সকল বয়সের মানুষের চিত্তবিনোদনের উদ্দেশ্যে নির্মিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার এই পার্কটি অল্প সময়ের মধ্যে ঠাকুরগাঁও জেলার অন্যতম পিকনিক স্পটে পরিণত হয়েছে। ফানসিটি শিশু পার্কের চমৎকার স্থাপত্য শৈলী এবং বিভিন্ন আকর্ষণীয় রাইড আগত দর্শনার্থীদের বিনোদিত করে।

ফুরমোন পাহাড়
বাংলাদেশের রূপের রানী রাঙ্গামাটির কোলে শান্তিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক অসাধারণ সুন্দর পাহাড়। বলছি ফুরমোন পাহাড় (Furomown Hill) এর কথা। প্রায় ১৫১৮ ফুট উচ্চতার এই পাহাড়টি এখনও অনেক পর্যটকের ভিড় থেকে দূরে, আপন রূপে মহিমান্বিত। যারা প্রকৃতির সেরা রূপটি দেখতে চান এবং নিজেদের একটু চ্যালেঞ্জ করতে প্রস্তুত, তাদের জন্য ফুরমোন পাহাড় আদর্শ গন্তব্য।

গাজনার বিল
পাবনা জেলা শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে সুজানগর উপজেলায় অবস্থিত গাজনার বিল (Gajnar Bil) একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান। বিলের প্রায় মাঝ দিয়ে দুই ভাগে বিভক্ত করে একটি সরু পাকা রাস্তা চলে গেছে। রাস্তার দুইপাশে আছে দিগন্ত বিস্তৃত পানির রাজ্য। বর্ষাকালে গাজনার বিলের এই রাস্তায় পানি যেন উপচে যেতে চায়। অপূর্ব এই বিলকে ঘিরে নানান প্রজাতির পাখি ও স্থানীয় জেলেদের জীবন আবর্তীত হয়। বলা যায় এখানকার প্রকৃতি ও অর্থনীতি অনেকটাই এই গাজনার বিল কেন্দ্রিক।