দর্শনীয় স্থান
বাংলাদেশের সেরা দর্শনীয় স্থানসমূহ আবিষ্কার করুন। প্রকৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অপূর্ব মিলনস্থল।

বিহার ধাপ
বিহার ধাপ (Bihar Dhap) বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত প্রত্নতাত্ত্বিক একটি স্থান। নাগর নদীর পাশ ঘেঁষা এই স্থাপনাটি স্থানীয়দের কাছে তোতারাম পণ্ডিতের ধাপ বা তোতারাম পণ্ডিতের বাড়ী নামেও সুপরিচিত। ধারণা করা হয় এই বিহারটি দ্বিতীয় নির্মাণ যুগের একটি নিদর্শন এবং আনুমানিক এগারো থেকে বারো শতকের মধ্যে এই প্রত্নস্থলের পতন ঘটে। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ্গের বিবরণে মাটির নিচ থেকে আবিষ্কৃত উঁচু টিলা আকৃতির বিহার ধাপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

বিলাসছড়া লেক, শ্রীমঙ্গল
বিলাসছড়া লেক (Bilashchora Lake) শ্রীমঙ্গলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অন্যতম আকর্ষণ। এই লেক স্থানীয়দের কাছে পাহাড় ডোবা লেক বা চেইন বাড়ি লেক নামেও পরিচিত। বিলাসছড়া লেক মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালিঘাট ইউনিয়নে বিলাসছড়া চা বাগানের ১০ নম্বর সেকশনে অবস্থিত।

বদেশ্বরী মহাপীঠ মন্দির
পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার বড়শশী ইউনিয়নের অন্তর্গত করতোয়া নদীর তীরে কারুকার্য মণ্ডিত প্রাচীন বদেশ্বরী মহাপীঠ মন্দির (Bodeshshori Mondir) অবস্থিত। ২ দশমিক ৭৮ একর জায়গা জুড়ে স্থাপিত মন্দিরের নামানুযায়ী বোদা উপজেলার বোদা নামকরন করা হয়েছে। প্রায় চারশ বছরের পুরনো এই বদেশ্বরী মহাপীঠ মন্দিরে রাজা দক্ষের কন্যা ও ভোলানাথ শিবের স্ত্রী সতীর বাম পায়ের গোড়ালির অংশ রয়েছে। তাই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে বড়দেশ্বরী মন্দিরের বিশেষ গুরুত্ব।

বঙ্গ সোনাহাট ব্রিজ
কুড়িগ্রাম জেলার ভূরুংগামারী উপজেলার বঙ্গ সোনাহাট ইউনিয়নে দুধকুমার নদীর উপর অবস্থিত এক ঐতিহাসিক সেতুর নাম বঙ্গ সোনাহাট ব্রিজ (Bongo Sonahat Bridge)। বাংলাদেশের লালমনিরহাট থেকে ভারতের মনিপুর রাজ্যে ইংরেজদের সৈন্য ও রসদ স্থানান্তরের সুবিধার্থে রেলপথ স্থাপনের অংশ হিসাবে ১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দে ভূরুংগামারীর দুধকুমার নদীর উপর প্রায় ১২০০ ফুট লম্বা বঙ্গ সোনাহাট রেল সেতু নির্মাণ করা হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্থানী সৈন্যদের যোগাযোগ ব্যহত করতে মুক্তিযোদ্ধারা এই সেতুর একটি অংশ গুড়িয়ে দেন। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে ব্রিজটি সংস্কার করে সাধারণ ব্রিজের মতোই ব্যবহার শুরু হয়।

বুধপাড়া কালীমন্দির
নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার বুধপাড়ায় প্রায় ৫৩০ বছরের পুরনো বুধপাড়া কালীমন্দির (Budhapara Sree Sree Kalimata Mondir) অবস্থিত। মন্দির স্থাপনের সময়কালে এই উপমহাদেশে নবাবী আমল চলছিল। আর নবাব আলিবর্দি খানের আমলে বর্গীয় হাঙ্গামা শুরু হয়। বর্গীদের অন্যায় অত্যাচার থেকে বাঁচতে ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরের খাগড়া থেকে ৬০ ঘর কংস বণিক নাটোরের বুধপাড়ায় এসে বসতি স্থাপন করে। সেসময় তারা কালীপূজায় অর্চনার জন্য খড়ের ঘরের একটি মন্দির তৈরি করেন। যা বর্তমানে বুধপাড়া কালীমন্দির হিসেবে পরিচিত। ফলে সমগ্র দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই মন্দিরের রয়েছে ঐতিহাসিক গুরুত্ব।

ছেঁড়া দ্বীপ, সেন্টমার্টিন
ছেঁড়া দ্বীপ (Chera Dwip) বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণের ভূখন্ড। প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দক্ষিণে ছেঁড়া দ্বীপ অবস্থিত। স্থানীয় মানুষের কাছে দ্বীপটি ‘ছেঁড়াদিয়া’ বা ‘সিরাদিয়া’ নামে পরিচিত। ছেঁড়া দ্বীপ সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পাথর, প্রবাল এবং নারিকেল গাছে পরিপূর্ণ। জোয়ারের সময় ছেঁড়া দ্বীপের এক-তৃতীয়াংশ সাগরের পানির নিচে তলিয়ে যায়। সাগরের নীল ঢেউ যখন পাথরের গায়ে আঁচড়ে পরে তখন এক মোহনীয় দৃশ্যের অবতারণা হয়।

কার্জন হল
কার্জন হল (Curzon Hall) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অবস্থিত প্রায় ১১৫ বছরের পুরনো একটি ঐতিহাসিক ভবন ও পুরাকীর্তি। বর্তমানে কার্জন হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও জীব বিজ্ঞান অণুষদের পাঠদানে ব্যবহার করা হচ্ছে। ১৯০৪ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি তৎকালীন গভর্ণর জেনারেল জর্জ কার্জন এই ভবনটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর থেকে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত কার্জন হল ঢাকা কলেজ ভবন হিসেবে ব্যবহার করা হত।

ঢোল সমুদ্র দীঘি
ঝিনাইদহ জেলার পাগলা কানাই ইউনিয়নে রাজা মুকুট রায়ের এক ঐতিহ্যবাহী মহাকীর্তির নাম ঢোল সমুদ্র দীঘি (Dhol Samudra Dighi)। শহর থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত ঝিনাইদহের সর্ববৃহৎ এবং শতবর্ষ পুরনো এই দীঘির প্রায় ৫২ বিঘা জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। ঢোল সমুদ্র দীঘির পাড়ে সারি সারি গাছ দীঘির সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। ছুটির দিনে ঢোল সমুদ্র দীঘির পাড়ে ঝিনাইদহ শহরের মানুষেরা পরিবার পরিজনদের সাথে সময় কাটাতে পছন্দ করেন।

ডিবির হাওর
ডিবির হাওর ( Dibir Haor ) সিলেটের জৈন্তাপুরে বাংলাদেশ ভারত সীমান্ত ঘেঁষা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। সিলেট শহর থেকে ডিবির হাওরের দূরত্ব ৪২ কিলোমিটার। ইয়াম, ডিবি, হরফকাটা, কেন্দ্রী বিল নামে এখানে মোট চারটি বিল রয়েছে। বর্ষাকালের পর বিলগুলো শাপলার রাজ্যে পরিণত হয়। তখন সমস্ত বিল জুড়ে হাজার হাজার লাল শাপলা ছড়িয়ে থাকে। ভোরে হাজারো লাল শাপলা আলোকিত করে রাখে চারপাশ। প্রকৃতি যেন আপন ইচ্ছের মাধুরীতে লাল শাপলার হাসিতে বিলগুলোকে সাজিয়ে দেয় পরম মমতায়। যেকোনো ভ্রমণপিপাসুদের সারাজীবন মনে রাখার জন্য শাপলা বিলে একটি সকালই যথেষ্ট। ডিবির হাওর তাই শাপলা বিল নামেও সবার কাছে পরিচিতি লাভ করেছে। এছাড়া এখানে প্রায় দুইশত বছরের পুরাতন একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দির রয়েছে। কথিত আছে, জৈন্তা রাজ্যের কোন এক রাজাকে ডিবির হাওরে কোথাও পানিতে ডুবিয়ে মারা হয়েছিল। ধারণা করা হয় তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে এ মন্দির নির্মিত হয়েছে। এছাড়া হরফকাটা ও ডিবি বিলের মধ্যস্থলে রাজা রাম সিংহের সমাধিস্থল রয়েছে। শীতকালে এই হাওর জুড়ে অথিতি পাখিদের রাজত্ব শুরু হয়। তখন সাদাবক, জলময়ুরী ও পানকৌড়ি ইত্যাদি বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখির কলরবে মুখর হয়ে থাকে ডিবির হাওরের চারপাশ।

দিনাজপুর রাজবাড়ী
দিনাজপুর শহরের খুব কাছে অবস্থিত দিনাজপুর রাজবাড়ী (Dinajpur Rajbari) অত্র জেলার ইতিহাস ও ঐশ্বর্যের প্রতীক হিসাবে পরিগণিত হয়ে আসছে। ১৯৫১ সালে জমিদারী প্রথার বিলুপ্তির পর থেকে দিনাজপুর রাজবাড়ীর জৌলুশে ভাটা পড়তে থাকে। দিনাজপুর রাজবাড়ীর সর্বশেষ জমিদার জগদীশনাথ ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। বর্তমানে এই রাজবাড়িটি কালের সাক্ষী হিসাবে টিকে আছে।

দয়াময়ী মন্দির
দয়াময়ী মন্দির (Doyamoyee Temple) জামালপুর জেলা শহরের জিরো পয়েন্টে অবস্থিত একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। ১৬৯৮ খ্রিস্টাব্দে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর আমলে শ্রীকৃষ্ণ রায় চৌধুরী এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় ৬৫ শতাংশ জমির উপর নির্মিত দয়াময়ী মন্দিরে আলাদাভাবে শিব, কালি, নাটমন্দির এবং মনসা দেবীর মন্দির স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া দয়াময়ী মন্দিরে শতবর্ষ পুরনো কারুকার্য খচিত বিভিন্ন দৃষ্টিনন্দন চিত্রকর্ম রয়েছে।

উপজাতীয় কালচারাল একাডেমী
নেত্রকোনা জেলা থেকে ৩৭ কিলোমিটার দূরে দূর্গাপুরের বিরিশিরিতে স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান উপজাতীয় কালচারাল একাডেমী (Ethnic Cultural Academy) অবস্থিত। মূলত বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে বসবাসরত হাজং, কোচ, ডালু, মান্দাই, বানাইসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করার লক্ষ্য নিয়ে উপজাতীয় কালচারাল একাডেমী প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি ফলক
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় কুড়িগ্রামে পাকিস্থানি হানাদার বাহিনী কতৃক বর্বোরোচিত হামলায় শহীদদের স্মরণে কুড়িগ্রাম শহরের ঘোষপাড়ায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি ফলক (Freedom Fighter Memorial Block) নির্মাণ করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের পর পাকিস্থানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সমগ্র বাংলাদেশের সাথে কুড়িগ্রামবাসীও উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছিল। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ৩১ মার্চ কুড়িগ্রামের স্থানীয় পুলিশ, আনসার, ছাত্র-জনতা ও ইপিআরদের নিয়ে একটি সম্মেলিত বাহিনী গড়ে তোলা হয়। কয়েক দফায় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাকিস্থানি বাহিনীর মুখোমুখি গুলি বর্ষণে বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়। পরবর্তীতে পাকিস্থানি বাহিনী ও রাজাকাররা কুড়িগ্রাম ছেড়ে লালমনিরহাট দখলের উদ্দেশ্যে চলে গেলে মুক্তিযোদ্ধারা কুড়িগ্রামের জনসাধারণকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।

গনেশ পাগল সেবাশ্রম
১২৫৫ বঙ্গাব্দে কোটালী পাড়া উপজেলার পোলসাইর গ্রামে সাধু পুরুষ গনেশ পাগল জন্মগ্রহণ করেন। গনেশ পাগলের পিতা শিরোমনি এবং মাতা নারায়ণী দেবী উভয়েই শ্রী শ্রী নারায়ন দেবের উপাসক ছিলেন। শ্রী শ্রী নারায়ন ঠাকুরের আশির্বাদে গনেশ পুজার দিন সন্তানের জন্ম হওয়ায় তাঁর নাম ‘গনেশ’ রাখা হয়। শ্রী বিন্দু দাস গোসাই-এর অনুচর মহামানব গনেশ পাগল ১৩৩৫ বঙ্গাব্দে মহাপ্রয়াণ করেন।

গেরদা ফলক
ফরিদপুর সদর থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে গেরদা গ্রামে অবস্থিত গেরদা মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে আরবি ভাষায় লেখা পাথরের এক বিশেষ ফলক রয়েছে, এই ফলকটিই গেরদা ফলক (Gerda Folok) হিসেবে পরিচিত। ধারণা করা হয়, ১০১৩ হিজরি বা ১৬০৪ খ্রিষ্টাব্দে লেখা মূলত এই ফলককে কেন্দ্র করে গেরদা মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে। আর ফলকটি নির্মাণ করা হয়েছে শাহ্ আলী বাগদাদি নির্মিত প্রাচীন এক মসজিদের ভগ্নাংশের উপর।

জমিদার গিরীশ চন্দ্র সেনের বাড়ি
গোপালগঞ্জ জেলার ভাটিয়াপাড়ায় মধুমতি নদীর তীরে ঐতিহাসিক গিরিশ চন্দ্র সেনের জমিদার বাড়ি (Zamindar Girish Chandra Sen’s House) অবস্থিত। জমিদার গিরীশ চন্দ্র সেন কত সালে এই বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন তা সঠিকভাবে জানা যায়নি। ইংরেজি U বর্ণের প্যাটার্ণে তৈরী দৃষ্টিনন্দন জমিদার বাড়ির মাঝের অংশটিতে একটি দ্বিতল ভবণ এবং দুইপাশে একতলা ভবন রয়েছে। দোতালার অংশে রয়েছে দুইটি কক্ষ ও দুইটি বারান্দা। তিন দিকে প্রাচীর বেষ্টিত জমিদার বাড়ির বামপাশে একটি মন্দির ও ডান পাশে ছনের তৈরী একটি কাছারি ঘর ছিল। মূল ভবনের পিছনের দিকে থাকা তিন কক্ষ বিশিষ্ট একতলা ভবনটি রন্ধনশালা হিসেবে ব্যবহৃত হত। প্রচুর বৃক্ষরাজিতে ঘেরা জমিদার বাড়ির সামনে আছে একটি পুকুর, যা জমিদার গিরীশ চন্দ্র সেন স্থানীয় জনগণদের জন্য খনন করেছিলেন। বর্তমানে কাশিয়ানি এম.এ খালেক ডিগ্রি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ গিরিশ চন্দ্র সেনের জমিদার বাড়িতে বসবাস করছেন।