দর্শনীয় স্থান
বাংলাদেশের সেরা দর্শনীয় স্থানসমূহ আবিষ্কার করুন। প্রকৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অপূর্ব মিলনস্থল।

মিয়ার দালান
ঝিনাইদহ জেলা সদর থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরে মুরারীদহ গ্রামে অবস্থিত মিয়ার দালান ( Miyar Dalan ) একটি ঐতিহ্যবাহী দর্শনীয় স্থান। ১২৩৬ বঙ্গাব্দে জমিদার কতৃক নির্মিত মিয়ার দালানটি ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় সেলিম চৌধুরী নামের এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়। তাই স্থানীয়ভাবে অনেকের কাছেই এটি সেলিম চৌধুরীর বাড়ি হিসাবেও পরিচিত। এছাড়া মিয়ার দালানকে বিশেষভাবে পরিচিত করেছিল এখানে থাকা একটি খেজুর গাছ। আর এই খেজুর গাছটির ১২টির বেশি চূঁড়া ছিল, যার প্রতিটি চূঁড়া থেকেই রস আহরণ করা যেত।

মিয়াওয়াকি বন
মিয়াওয়াকি বন (Miyawaki Forest) চট্টগ্রাম শহরের প্রাণকেন্দ্রে এবং মিরসরাইয়ের সোনাপাহাড় এলাকায় কৃত্রিমভাবে তৈরি এক চিলতে সবুজ অরণ্য। জাপানি উদ্ভিদবিজ্ঞানী আকিরা মিয়াওয়াকির (Akira Miyawaki) পদ্ধতিতে তৈরি এই বনগুলো নাগরিক ব্যস্ততার মাঝে সজীব নিশ্বাস। অল্প জায়গায় স্বল্প সময়ে জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনার এই মডলেটি এখন পর্যটক এবং পরিবেশপ্রেমীদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়।

মধুমতি বাওড়
গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলা থেকে ১০ কিলোমিটার পূর্বে মধুমতি বাওড় (Modhumoti Baor) অবস্থিত। কাশিয়ানি উপজেলার ফুকরা, ধানকোড়া, রাতইল, চাপ্তা, ঘোনাপাড়া, পরানপুর, সুচাইল, তারাইল, পাংখার চর ও চরভাটপাড়া মৌজা জুড়ে মধুমতি বাওরের অবস্থান। সত্তর দশকের শেষের দিকে মধুমতি নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে ১.৫ কিলোমিটার দূরে দুই দিকে দুইটি বাঁকের সৃষ্টি হয়। যার একটি বাঁকের মুখে পলি জমে উজানের মুখটি বন্ধ হয়ে একটি জলাশয়ের সৃষ্টি হয়। আর এই জলাশয়টিই মধুমতি বাওড় নামে পরিচিত।

মোকাররম আলী শাহ (র:) দরগাহ
মাগুরা জেলার ইছাখাদা গ্রামে হযরত পীর মোকররম আলী শাহ (র:) দরগাহ (Mokarram Ali Shah (R) Dargah) অবস্থিত। মাগুরা শহর থেকে মাত্র ৭ কিলোমিটার পশ্চিম দিকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের কাছে পূর্ববাহিনী নবগঙ্গা নদীর তীরে দরগার অবস্থান। নদীর পাড়ে সবুজ বৃক্ষের ছায়ায় রয়েছে আধ্যাত্মিক সাধক হযরত পীর মোকাররম আলী শাহ (র:) -এর সমাধি। জানা যায়, হন আনুমানিক ১৪০০ খ্রিষ্টাব্দে বিখ্যাত ধর্ম প্রচারক খান জাহান আলী (র:) ১২ জন শিষ্য নিয়ে যশোরের বারবাজারে আগমণ করেন। এরপর খান জাহান আলী (র:) বাগেরহাট গমণ করেন।

মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ি
মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা উপজেলার একটি ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন স্থাপনা। ময়মনসিংহ থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে এই মুক্তাগাছা রাজবাড়ির অবস্থান। তৎকালীন মুক্তাগাছার জমিদার বৃটিশদের কাছ থকে প্রথমে রাজা এবং পরবর্তিতে মহারাজা উপাধি পেয়েছিলেন। তাই জমিদারের এই বাসভবনকে মুক্তাগাছা রাজবাড়ী বলা হয়। মুক্তাগাছা জমিদারির ১৬ টি অংশ ১৬ জন জমিদার শাসন করতেন। মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ির প্রবেশমুখে আছে বিশালাকার সিংহ দরজা। রাজবাড়ির ভেতরে আছে জমিদারের মায়ের ঘর, মন্দির, দরবার হল, কাচারিঘর, অতিথি ঘর, সিন্দুক ঘর এবং অন্যান্য ভবন। এছাড়াও এই রাজ বাড়িতে প্রায় ১০,০০০ বইয়ের একটি দূর্লভ লাইব্রেরি ছিল, যা বিভিন্ন সময়ে হুমকির সম্মুখীন হয়। বর্তমানে এর কিছু অংশ মুক্তাগাছা বাংলা একাডেমীতে রক্ষিত আছে। প্রায় ১০০ একর জায়গার ওপর নির্মিত মুক্তাগাছা রাজবাড়িটি প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শনের সাক্ষী হয়ে আছে। বর্তমানে রাজবাড়িটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

নলতা শরীফ, কালীগঞ্জ
নলতা শরীফ (Nalta Sharif) সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার নলতা গ্রামে অবস্থিত। নলতা গ্রামে ১৮৭৩ সালের ডিসেম্বর মাসে জন্মগ্রহন করেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, শিক্ষা সংস্কারক ও সমাজহিতৈষী খান বাহাদুর আহসানউল্লাহ। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান অনস্বীকার্য এছাড়াও আউলিয়া হিসাবে তিনি ছিলে সমাদৃত। ১৯৬৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি খান বাহাদুর আহসানউল্লাহ-র মৃত্যুর পর তাঁকে নলতায় সমাহিত করা হয়। পরবর্তীকালে তাঁর সমাধিস্থলকে কেন্দ্র করে বর্তমানে খান বাহাদুর আহসানউল্লাহ সমাধি কমপ্লেক্স বা নলতা শরীফ গড়ে উঠেছে।

নন্দন পার্ক
নাগরিক জীবনের কর্মব্যস্ততার ভীড়ে অল্প সময়ের অবসরে চিত্তবিনোদনের সুযোগ তৈরি করার উদ্দেশ্যে ২০০৩ সালে সাভারের নবীনগর-চন্দ্রা হাইওয়ের বাড়ইপাড়া এলাকায় নন্দন পার্ক (Nandan Park) গড়ে তোলা হয়। সবুজে ঢাকা প্রায় ৩৩ একর আয়তনের এই পার্কের রয়েছে নিরাপদ এবং আন্তর্জাতিক মানের বিভিন্ন দেশি বিদেশি রাইড, ফাইভ-ডি মুভি থিয়েটার, ওয়াটার ওয়ার্ল্ড, রেস্টুরেন্ট, রিসোর্ট এবং সুপরিসর কার পার্কিং সুবিধা।

নীল দিগন্ত
নীল দিগন্ত পর্যটন কেন্দ্র বান্দরবান জেলা থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে থানচি উপজেলার জীবন নগর এলাকায় অবস্থিত। প্রায় সাড়ে ৩ একর জায়গা নিয়ে পাহাড়চূড়ায় গড়ে উঠা পর্যটন কেন্দ্র থেকে হাত বাড়িয়ে মেঘ ছোঁয়ার অপার্থিব আনন্দ উপভোগ করা যায়। সারি সারি সবুজ পাহাড়ের সাথে সাদা মেঘের খেলা নীল দিগন্তকে করেছে মোহনীয়।

নেভারল্যান্ড
রাজধানী ঢাকার মিরপুর ১-এর চটবাড়ী এলাকায় আশুলিয়া বেড়িবাঁধ সড়কে প্রায় ১২ একর জমির উপর দৃষ্টিনন্দন পিকনিক ও শুটিং স্পট নেভারল্যান্ড – দ্যা আরবান এস্কেপ (Neverland) গড়ে তোলা হয়েছে। রাজধানী ঢাকার মধ্যে বৃক্ষের সুশীতল ছায়াঘেরা নদী তীরের মুক্ত বাতাস ও কোলাহলহীন পরিবেশে পরিবার কিংবা বন্ধু-বান্ধবের সাথে অবসর সময় কাটানোর জন্য নেভারল্যান্ড একটি সেরা বিনোদন কেন্দ্রের নাম।

নীলসাগর
নীলফামারী জেলার গোড়গ্রাম ইউনিয়নে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক দিঘীর নাম নীলসাগর (Nilsagar)। নীলফামারী জেলা সদর থেকে নীলসাগরের দূরত্ব প্রায় ১৪ কিলোমিটার। অষ্টম শতাব্দীতে বৈদিক রাজা ‘বিরাট’ এই ঐতিহাসিক দিঘিটি খনন করেন বলে ধারণা করা হয়। বিরাট রাজার নামানুসারে একসময় দিঘীটি বিরাট দিঘী নামে পরিচিতি লাভ করে৷ পরবর্তীতে অনেকে একে বিন্না দিঘি নামে ডাকতে শুরু করে এবং ১৯৭৯ সালে এই দিঘীটির নামকরণ করা হয় নীলসাগর। নীলসাগরের মোট জমির পরিমাণ ৫৩.৯০ একর। এর মধ্যে জল ভাগের মোট আয়তন ৩২.৭০ একর এবং দিঘির পাড়ের জমির পরিমাণ ২১ একর। বর্তমানে নীলসাগরের আশেপাশের পরিবেশকে ভ্রমণপিপাসু মানুষের চিত্তবিনোদনের উপযোগী করার জন্য বিভিন্ন ধরণের সংস্কার কাজ করা হয়েছে। সাথে নির্মাণ করা হয়েছে একটি রেস্ট হাউস, প্রবেশ তোরণ এবং মসজিদ। আর দিঘীর পাড়ের ভবিষ্যৎ সৌন্দর্য অক্ষত রাখতে পাড়ে লাগানো হয়েছে বেশকিছু বিভিন্ন ধরণের বৃক্ষ।

নয় গম্বুজ মসজিদ
মসজিদের শহর বাগেরহাটের ঠাকুর দীঘির পশ্চিম পাড়ে এবং খানজাহান (রঃ) এর সমাধির দক্ষিণ-পূর্বে ঐতিহাসিক নয় গম্বুজ মসজিদ (Nine Dome Mosque) অবস্থিত। ১৫ শতাব্দীতে নির্মিত বর্গাকৃতির এই মসজিদের প্রতিটি দেয়ালের দৈর্ঘ্য ১৫.২৪ মিটার এবং পুরুত্ব ২.২৩ মিটার। মসজিদের ছাদে রয়েছে নয়টি অর্ধ বৃত্তাকার গম্বুজ। গম্বুজগুলোকে স্থায়িত্ব প্রদানের জন্য মসজিদের অভ্যন্তরে চারটি বিশেষ স্তম্ভ রয়েছে। মসজিদের পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ দিকের দেয়ালে ৩টি করে প্রবেশ পথ প্রত্যক্ষ করা যায়। আর পশ্চিম দিকের দেয়ালে আছে ৩টি সুদৃশ্য মিহরাব।

নর্থব্রুক হল
১৮৭৪ সালে ভারতের গভর্নর জেনারেল জর্জ ব্যরিং নর্থব্রুকের ঢাকা সফরকে স্মরণীয় করে রাখতে মোগল স্থাপত্যরীতি ও ইউরোপীয় কারুকাজের অপূর্ব সংমিশ্রণে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ফরাশগঞ্জ এলাকায় নর্থব্রুক হল (Northbrook Hall) নির্মাণ করা হয়। শুরুতে টাউন হল হিসাবে নর্থব্রুক হল নির্মাণ করা হলেও পরবর্তীতে একে গণগ্রন্থাগারের রূপ দিয়ে সাথে জনসন হল নামে একটি ক্লাব ঘর বানানো হয়। ভবনের রং লাল হওয়ার কারণে নির্মাণের পর থেকেই স্থানীয় লোকজনের কাছে নর্থব্রুক হল লালকুঠি নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৯২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নর্থব্রুক হলে সংবর্ধনা দেয়।

ভোঁদড় দিয়ে মাছ শিকার
নড়াইল জেলা সদরের কলোড়া ইউনিয়নের গোয়ালবাড়ি গ্রাম বাংলাদেশে ভোঁদড় দিয়ে মাছ শিকারের জন্য বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। দেশব্যাপী ভোঁদড় দ্বারা মাছ ধরার সনাতন এই পদ্ধতির বিলুপ্তি ঘটলেও গোয়ালবাড়ি গ্রামের প্রায় ২৬২৭ টি পরিবার আজো এই প্রাচীন পদ্ধতিতে মাছ ধরে থাকে। ভোদড় প্রচন্ডভাবে মাছের প্রতি আসক্ত একটি প্রাণী। ভোদড়ের এমন আচরণকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় জেলেরা মাছ শিকার করেন। এই পদ্ধতিতে মাছ ধরতে যাওয়ার আগে ভোঁদড়কে পেট ভরে মাছ খাওয়ানো হয় তারপর নৌকায় বাঁধা জাল নদীতে ফেলে ভোদড় ছেড়ে দেয়া হয়। ভোদড় তার স্বভাবসুলভ আচরণে খাবার জন্য মাছ তাড়িয়ে নিয়ে যায়, আর মাছেগুলো জেলেদের জালে আটকা পড়ে। শিকারে পর জেলেদের ধরা মাছের একটা অংশ ভোঁদড়ের জন্য বরাদ্ধ রাখা থাকে। এ কারণে ভোঁদড় আর জেলেদের বিশ্বস্ততা বজায় থাকে। নড়াইল অঞ্চলের জেলেরা তাই ভোঁদড়কে অন্যান্য গৃহপালিত প্রাণীর মত লালনপালন করেন।

পাহাড়পুর জাদুঘর
নওগাঁ জেলায় অবস্থিত দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের কাছে ষাটের দশকে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে পাহাড়পুর জাদুঘর (Paharpur Bihar Museum) প্রতিষ্ঠা করা হয়। নওগাঁ থেকে প্রায় ৩৩ কিলোমিটার দূরে পাহাড়পুর ইউনিয়নের পাহাড়পুর গ্রামে অবস্থিত এই জাদুঘরে সংরক্ষিত বিভিন্ন প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো আগত দর্শনার্থীদের কাছে প্রধান আকর্ষণ।

পান্থুমাই ঝর্ণা
‘পান্থুমাই’ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত মেঘালয় পাহাড়ের কোল ঘেঁষা একটি অপূর্ব গ্রামের নাম। সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের এই গ্রাম বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর গ্রামগুলোর মধ্যে অন্যতম। মেঘালয় পাহাড় আর পিয়াইন নদীর পাড়ে অবস্থিত এই গ্রামেই আছে প্রকৃতির আরেক অপরূপ নিদর্শন পান্থুমাই ঝর্ণা (Panthumai Waterfall)। স্থানীয় মানুষের কাছে পান্থুমাই ঝর্ণা বিভিন্ন নামে পরিচিত। কেউ একে বলেন ‘ফাটাছড়ির ঝর্ণা’ আবার কেউবা ডাকেন ‘বড়হিল ঝর্ণা’, আর কারো চোখে এটি ‘মায়াবতী’!

পরশুরামের প্রাসাদ
বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় মহাস্থানগড়ের সীমানায় আবিষ্কৃত প্রাচীন সভ্যতার অন্যতম এক নিদর্শনের নাম পরশুরামের প্রাসাদ (Parsuram Palace)। মহাকালী কুণ্ড থেকে ২০০ মিটার উত্তরে এই প্রাসাদের অবস্থান। এখানকার শেষ হিন্দু রাজা ও বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার পরশুরামের নামানুসারে এই প্রাসাদের নামকরণ করা হয়, স্থানীয়দের কাছে যা হিন্দু নৃপতি পশুরামের প্যালেস নামে পরিচিত।