দর্শনীয় স্থান
বাংলাদেশের সেরা দর্শনীয় স্থানসমূহ আবিষ্কার করুন। প্রকৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অপূর্ব মিলনস্থল।

বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলা যেন সব প্রাকৃতিক রূপ নিয়ে বসে আছে। এখানে আছে পাহাড়, লেক, ঝর্ণা, সমুদ্র সৈকত, প্রাচীন স্থাপনাসহ নানা কিছু। বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত (Bashbaria Sea Beach) পর্যটকদের কাছে এক বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে মনে জায়গা করে নিয়েছে। ঝাউগাছের সারি, খোলামেলা পরিবেশ, জেগে ওঠা সবুজ ঘাসের চর, পিকনিক স্পট সব মিলিয়ে বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত অপূর্ব সৌন্দর্য নিয়ে অপেক্ষা করছে দর্শনার্থীদের জন্য।

বেলাব বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ
নরসিংদী জেলা থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দূরে বেলাব উপজেলায় প্রায় ৩০০ বছরের পুরাতন বেলাব বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ (Belabo Bazar Central Jame Masjid) অবস্থিত। কাঠামোগত অনন্য নির্মাণশৈলীর জন্য দেশের সেরা মসজিদগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। বেলাব বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদটি দুইবার নির্মাণ করা হয়েছে। প্রাথমিক নির্মাণকালে এই মসজিদটিতে ৭টি গম্বুজ ছিল। প্রচলিত আছে, প্রতিষ্ঠালগ্নে এই মসজিদের ভিতর থেকে অলৌকিক বা গায়েবি ভাবে কুরআন তেলওয়াতের সুর শোনা যেত। ফলে এই মসজিদটি “ফজিলতের মসজিদ” হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

বিবি বেগনী মসজিদ
বাগেরহাট সদর উপজেলায় ষাট গম্বুজ মসজিদ থেকে ৮০০ মিটার পশ্চিমে ঘোড়া দীঘির পাড়ে অবস্থিত বিবি বেগনী মসজিদ (Bibi Begni Mosque) একটি প্রত্ততাত্ত্বিক স্থাপনা। ধারণা করা হয়, পঞ্চদশ শতকে খান জাহান আলীর আমলে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। মসজিদের নামকরণের ব্যাপারে সঠিকভাবে জানা যায় না গেলেও অনেকের মতে, বিবি বেগনী সম্ভবত খান জাহান (রঃ) এর একজন ঘনিষ্ঠ অনুসারী বা খান-ই-জাহানে স্ত্রী ছিলেন। আর তার নামানুসারেই মসজিদটির নামকরণ করা হয়। বিবি বেগনি মসজিদের স্থাপত্যের সাথে বাগেরহাটের সিঙ্গাইর মসজিদের মিল রয়েছে।

বিবি চিনি মসজিদ
বাংলাদেশে মোগল স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন বিবি চিনি শাহী মসজিদ (Bibicini Shahi Mosque) বরগুনা জেলার বেতাগী উপজেলার বিবিচিনি ইউনিয়নে ছোট্ট টিলার উপর নির্মাণ করা হয়েছে। নানা ধরনের বৃক্ষ ঘেরা এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি বেতাগী উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

বিল রুট ক্যানেল
বিল রুট ক্যানেল (Bill Root Canal) মাদারীপুর- গোপালগঞ্জ মহাসড়ক ও আড়পাড়া মুন্সীবাড়ির পাশ দিয়ে সরল পথে প্রবাহিত একটি ঐতিহবাহী খাল। বিল রুট ক্যানেলের মাধ্যমে টেকেরহাট এলাকায় আড়িয়াল খাঁ ও মধুমতি নদী একত্রে মিলিত হয়েছে। এছাড়া মাদারীপুর জেলার বেশীরভাগ ছোট বড় খাল ও জলাভূমি বিল রুট ক্যানেলের মাধ্যমে একীভূত হয়েছে বলে স্থানীয়রা এই খালকে মাদারীপুর বিল রুট বলে থাকেন। স্যার আরথার কটন ১৮৫৮ সালে বিল রুট ক্যানেল খননের প্রস্তাব উপস্থাপন করলেও ১৮৯৯ সালে এই খালের খনন শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯১৪ সালে এটি জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য খুলে দেয়া হয়।

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ
মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী ধলই চা বাগানে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ (Bir Shrestho Hamidur Rahman Monument) অবস্থিত। ঝিনাইদহে জন্ম নেয়া বীর সন্তান হামিদুর রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন সাহসী সিপাহী ছিলেন। ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে হামিদুর রহমান সিলেটের শ্রীমঙ্গল এলাকায় যুদ্ধ করছিলেন। ২৮ অক্টোবর সকালে দলের অধিনায়কের নির্দেশে হামিদুর রহমান ধলই বিওপি-তে পাকিস্থানীদের ঘাটি দখলের জন্য অগ্রসর হন। হালকা একটি মেশিনগান নিয়ে জীবন বাজি রেখে হামিদুর রহমান একাই দুইটি পাকিস্থানি যুদ্ধ ট্যাঙ্ক ধ্বংস করেন। এতে শত্রুঘাটির অধিনায়ক এবং বেশ কয়েকজন সৈন্য নিহত হয়। একসময় যুদ্ধরত অবস্থায় এই বীর সন্তান শত্রুদের পাল্টা আক্রমনে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তাঁর আত্নত্যাগের কয়েকদিনের মধ্যেই ধলই সীমান্ত ফাঁড়ি মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। সহযোদ্ধারা হামিদুর রহমানের মৃতদেহ সীমান্তের ওপারে নিয়ে ভারতের আমবাসা গ্রামের একটি মসজিদের পাশে সমাধিস্থ করেন।

বিরিশিরি
বিরিশিরি (Birishiri) নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলায় অবস্থিত একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রাম। বিরিশিরির বিজয়পুরে আকর্ষনীয় চীনামাটির পাহাড় ও নীল পানির হ্রদ রয়েছে। বিজয়পুরের এই চীনামাটির পাহাড় এবং সমভূমি দৈর্ঘ্যে প্রায় ১৬ কিলোমিটার ও প্রস্থে ৬০০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। হ্রদের নীল জল নিমিশেই সমস্ত ক্লান্তি ও অবসাদ দূর করে দেয়। হ্রদের অপরুপ নীল জলের প্রধান উৎস হচ্ছে সমেশ্বরী নদী। এই নদী বর্তমানে কয়লা খনি হিসেবে অধিক পরিচিত। নীল জ্বলের হ্রদের মতই সোমেশ্বরী নদী আপন রুপে অনন্যা।

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের সমাধি
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান (Birshreshtha Hamidur Rahman) ১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারী বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার অন্তর্গত তৎকালীন যশোর জেলার মহেশপুর উপজেলার খর্দ্দ খালিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মোহাম্মদ হামিদুর রহমানের পিতার নাম আক্কাস আলী মন্ডল এবং মাতার নাম মোসাম্মাৎ কায়মুন্নেসা। ১৯৭০ সালে হামিদুর রহমান পাকিস্থান সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে সিপাহী পদে যোগ দেন৷

বঙ্গবন্ধু আইল্যান্ড
খুলনা বিভাগের মোংলা উপজেলার দুবলার চর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে হিরণ পয়েন্ট ও দুবলার চরের মাঝখানে বঙ্গোপসাগরে বঙ্গবন্ধু আইল্যান্ড (Bongobondhu Island) বা বঙ্গবন্ধু দ্বীপ (Bongobondhu Dwip) অবস্থিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় দুই মিটার উচ্চতায় অবস্থিত চরটির আয়তন প্রায় ১০ বর্গ কিলোমিটার। আশেপাশের স্থানীয় জেলেরা মাছ ধরতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু আইল্যান্ড খুঁজে পেলেও চর আবিষ্কারের সুনিদৃষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ১৯৯২ সালে মালেক ফরাজী নামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এক ভক্ত দুজন সাথী নিয়ে এই দ্বীপে নামেন এবং পরবর্তীতে তিনি সেখানে বঙ্গবন্ধু আইল্যান্ড নামের একটি সাইন বোর্ড লাগিয়ে আসেন।

বড় কাটরা
পুরান ঢাকার চকবাজারের বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে মুঘল আমলের এক ঐতিহাসিক নিদর্শন বড় কাটরা (Bara Katra) অবস্থিত। ১৬৪১ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট শাহজাহানের পুত্র শাহজাদা শাহ সুজার নির্দেশে প্রধান স্থপতি মীর আবুল কাসেম এই স্থাপনাটি নির্মাণ করেন। আবুল কাসেমকে সে সময় ‘মীর-ই-ইমারত’ নামে আখ্যায়িত করা হত। শাহজাদা শাহ সুজার বসবাসের জন্য বড় কাটরা নির্মিত হলেও পরবর্তী সময়ে এটি মুসাফিরখানা হিসাবে ব্যবহৃত হতে থাকে।

চাটমোহর শাহী মসজিদ
পাবনা জেলা থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে চাটমোহর উপজেলার কেন্দ্রস্থলে প্রাচীন স্থাপত্য শিল্পের অপূর্ব এক নিদর্শন ঐতিহাসিক চাটমোহর শাহী মসজিদ (Chatmohor Shahi Masjid) অবস্থিত। মসজিদ থেকে প্রাপ্ত শিলালিপির তথ্য মতে, ১৫৮১ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আকবরের শাসনামলে সৈয়দ নেতা আবুল ফতে মোহাম্মদ মাসুম খাঁর অর্থায়নে তারই সহোদর মুহামদ্দ বিন তুর্কি খান কাকশাল চাটমোহরে মসজিদটি নির্মাণ করেন। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট চাটমোহর শাহী মসজিদের নির্মাণ কৌশলে প্রাচীন সুলতানী স্থাপত্যের প্রভাব রয়েছে। বগুড়ার খেরুয়া মসজিদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছোট ছোট পাতলা জাফরী ইটের সমন্বয়ে নির্মিত চাটমোহর শাহী মসজিদের দৈর্ঘ্য ৪৫ ফুট, প্রস্থ ২২ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং উচ্চতা ৪৫ ফুট।

চর বিজয়
সাগরকন্যা কুয়াকাটার পূর্বে গঙ্গামতী জঙ্গলের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে উঠা মনোমুগ্ধকর এক দ্বীপের নাম চর বিজয় (Chor Bijoy)। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে একদল ভ্রমণ পিপাসু অভিযাত্রিক পটুয়াখালী জেলার এই দ্বীপের সন্ধান লাভ করে। বিজয়ের মাসে আবিষ্কারের কারণে দ্বীপটিকে ‘চর বিজয় বা The Victory Island নাম দেয়া হয়। তবে স্থানীয় জেলেদের কাছে এটি হাইরের চর (মাছ ধরার নির্ধারিত সীমানা) নামেই বেশী পরিচিত। জনবসতিহীন এই দ্বীপের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য ও সমুদ্রের বিস্তীর্ণ জলরাশি আগত সকল ভ্রমণকারীদের মুগ্ধ করে। আর তাই এডভেঞ্চারপ্রেমী পর্যটকরা ক্যাম্পিং করার চর বিজয়কে স্থান দিয়েছেন পছন্দের তালিকার শীর্ষে।

চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য
চট্টগ্রাম জেলা শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে লোহাগাড়া উপজেলার চুনতিস্থ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে অবস্থিত চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য (Chunati Wildlife Sanctuary) এশিয়ান হাতি প্রজনন এবং দক্ষিণ পূর্ব উপমহাদেশীয় জীববৈচিত্র্যের এক গুরুত্বপূর্ণ ভান্ডার। ১৯৮৬ সালে সাতকানিয়া, চকরিয়া, বাঁশখালী ও লোহাগাড়া অঞ্চলের প্রায় ১৯ হাজার ১৭৭ একর (৭,৭৬৪ হেক্টর) বনভূমি নিয়ে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য প্রতিষ্ঠা করা হয়।

ডিসি পার্ক
২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে ফৌজদার হাট বক্ষব্যাধি হাসপাতাল এর কাছে একটি সরকারি জমি দখলমুক্ত করে করে সেখানে একটি বিশেষ বাগান তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে প্রায় ৫০ লাখ টাকা খরচ করে দুবাইয়ের মিরাকেল গার্ডেন এর আদলে তৈরি করা হয় ফুলের সাম্রাজ্য। যা বর্তমানে চট্টগ্রাম ডিসি পার্ক (DC Park Chittagong) নামে পরিচিতি।

ধানুকা মনসা বাড়ি
প্রায় ছয়শত বছরের প্রাচীন ধানুকা মনসা বাড়ি ( Dhanuka Manasha Bari ) শরীয়তপুর জেলার প্রবীণ ব্যক্তিবর্গের কাছে ময়ুর ভট্টের বাড়ি নামে পরিচিত। ধানুকা মনসা বাড়িতে সুলতানী ও মোগল আমলের স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত ৫ টি ইমারত রয়েছে। যার মধ্যে আছে দুর্গা মন্দির, মনসা মন্দির, কালি মন্দির, নহবতখানা এবং আবাসিক ভবন।

দিল্লির আখড়া
কিশোরগঞ্জ জেলার ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে প্রায় সাড়ে চারশত বছরের পুরনো দিল্লির আখড়া (Dhillir Akhra) অন্যতম। কিশোরগঞ্জের মনোরম একটি হাওরাঞ্চল মিঠামইন উপজেলার কাটখাল ইউনিয়নে দিল্লির আখড়ার অবস্থান। নাম দিল্লির আখড়া হলেও বাস্তবে ভারতে দিল্লির সাথে এই আখড়ার আলাদা কোন সম্পর্ক নেই। জানা যায়, দিল্লির সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে আধ্যাত্মিক সাধু নারায়ন গোস্বামী এই আখড়াটি স্থাপন করেন। আখড়ার ভেতরে ধর্মশালা, নাটমন্দির, অতিথিশালা, পাকশালা, বৈষ্ণবদেব থাকার ঘর, সাধক নারায়ন গোস্বামী এবং তাঁর অন্যতম শিষ্য গঙ্গারাম গোস্বামীর সমাধি রয়েছে।