দর্শনীয় স্থান
বাংলাদেশের সেরা দর্শনীয় স্থানসমূহ আবিষ্কার করুন। প্রকৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অপূর্ব মিলনস্থল।

কুমারী ঝর্ণা
বাংলাদেশের পাহাড়ি জনপদ বান্দরবান যেন প্রকৃতির এক রহস্যময় ভান্ডার। এখানে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ঝর্ণা। এইসব ঝর্না দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে ছুটে আসেন পর্যটকরা। তেমনই এক মন মুগ্ধকর ঝর্ণা হলো কুমারী ঝর্ণা যা বর্ষার সময় তার পূর্ণ যৌবন লাভ করে। এটি শুধু একটি ঝর্না নয়, এটি যেন প্রকৃতির নির্জন কোলে বসে থাকা এক মিষ্টি কুমারীর হাসি।

রাবার বাগান, পরশুরাম
ফেনী জেলার পরশুরাম উপজেলার মির্জানগর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী জয়ন্তী নগর গ্রামে ব্যাক্তিগত উদ্যোগে পরশুরাম রাবার বাগান (Rubber Garden) গড়ে তোলা হয়েছে। ২০১০ সালে হাজী মোঃ মোস্তফা প্রায় ২৫ একর জায়গা জুড়ে ৮,০০০ রাবার গাছ রোপণের মাধ্যমে এই বাগান প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে দীর্ঘ ৮ বছর পরিচর্চার মাধ্যমে ২০১৮ সালে এই রাবার বাগান থেকে প্রথম কষ আরোহণ শুরু হয়।

দেবতাখুম
দেবতাখুম (Debotakhum) বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলায় অবস্থিত এক অপরূপ প্রাকৃতিক বিস্ময়। খুম শব্দের অর্থ হচ্ছে গভীর জলাধার বা জলপ্রপাত-পরবর্তী শান্ত নদী অববাহিকা। দেবতাখুম মূলত বান্দরবানের অন্যতম পাহাড়ি স্রোতস্বিনী তারাছা খালের একটি অংশ, যার দুই পাশে আকাশছোঁয়া পাথুরে পাহাড় এবং মাঝখানে জমে থাকা গভীর নীল পানি। বান্দরবানে ছোট-বড় অনেক খুম আছে, যেমন থানচির বিখ্যাত আমিয়াখুম , ভেলাখুম বা সাতভাইখুম । তবে বান্দরবানে ঘুরে দেখার মতো যতগুলো খুম বা গিরিপথ রয়েছে, তাদের মধ্যে দেবতাখুম সবার কাছেই সবচেয়ে জনপ্রিয়। এর প্রধান কারণ হলো, অন্যান্য দুর্গম খুমগুলোর তুলনায় খুব সহজেই এবং কম ট্র্যাকিং করে এই স্বর্গের মতো জায়গা থেকে ঘুরে আসা যায়। স্থানীয় মারমা, ত্রিপুরা ও তঞ্চঙ্গ্যা অধিবাসীদের মতে, এই খুমের কিছু কিছু জায়গা প্রায় ৭০ থেকে ৮০ ফুট পর্যন্ত গভীর।

খৈয়াছড়া ঝর্ণা
খৈয়াছড়া ঝর্ণা (Khoiyachora Waterfall) চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে অবস্থিত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঝর্ণাগুলোর মধ্যে অন্যতম। খৈয়াছড়া ঝর্ণার নয়টি ধাপ ও নান্দনিক সৌন্দর্য্য দেখে ভ্রমণপিয়াসী মানুষ প্রতিনিয়তই মুগ্ধ হচ্ছে। গ্রামের সবুজ শ্যামল আঁকাবাঁকা মেঠো পথ আর পাহাড়ের হাতছানিতে অনন্য খৈয়াছড়ার আবেদন উপেক্ষা করা বেশ কঠিন তাইতো প্রকৃতিপ্রেমীরা খৈয়াছড়া ঝর্ণাকে বাংলাদেশের ঝর্ণা রানী হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন। সাধারণ ঝর্ণা দর্শনের পাশাপাশি অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্য এখানে রেপলিং (Rappelling) ও জুমারিং (Jummaring) করার চমৎকার সুযোগ রয়েছে।

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান
২০০৫ সালে প্রায় ২৪৩ হেক্টর জায়গা নিয়ে সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলায় রঘুনন্দন পাহাড়ে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রাকৃতিক ভাবে গড়ে উঠা সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে অবস্থিত সাতটি পাহাড়ি ছড়া বা ঝর্ণা থেকে এই স্থানের নামকরণ করা হয় সাতছড়ি। পূর্বে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান (Satchari National Park) ‘রঘুনন্দন হিল রিজার্ভ ফরেস্ট’ নামে পরিচিত ছিল।

হরিণপালা রিভার ভিউ ইকোপার্ক
পিরোজপুর (Pirojpur) জেলার ভাণ্ডারিয়া উপজেলার তেলিখালী ইউনিয়নে কঁচা নদীর তীরে ২০১৪ সালে ৬ একর জায়গার উপর হরিণপালা রিভার ভিউ ইকোপার্ক (Horinpala River View Eco Park) গড়ে তোলা হয়েছে। নদীর ঢেউ, কাশবন, পাখির কলকাকলীতে মুখর চমৎকার এই পার্কে রয়েছে নান্দ্যনিক ফোয়ারা, ওয়াচ টাওয়ার, পশুপাখির ভাস্কর্য, ঘোড়ার গাড়ি, টয় ট্রেন এবং বিভিন্ন আকর্ষণীয় রাইড। আরও আছে সুবিশাল পুকুরে নৌকায় চড়ে বেড়ানোর সুযোগ।

রাংপানি
সিলেটের শ্রীপুর এলাকায় অবস্থিত সীমান্তবর্তী নদী ‘রাংপানি’ (Rangpani)। রাংপানির স্বচ্ছ জল মেঘালয়ের জৈন্তা পাহাড়ের রানহংকং জলপ্রপাত থেকে উৎপন্ন হয়েছে। অনেকের কাছে এটি ‘শ্রীপুর পাথর কোয়ারি’ নামেও পরিচিত। রাংপানি নদীর তীরে খাসিয়াদের মোকামপুঞ্জি গ্রাম অবস্থিত। খাসিয়ারা গ্রামকে পুঞ্জি নামেই ডাকে। রাংপানি ও পুঞ্জির আশেপাশের এলাকায় ৮০-৯০ দশকে অনেক বাংলা চলচ্চিত্রের দৃশ্য ধারণ করা হতো। নাঈম-শাবনাজ জুটির প্রথম চলচ্চিত্র ‘চাঁদনী’র জনপ্রিয় গান ‘ও আমার জান, তোর বাঁশি যেন জাদু জানে রে’ ছাড়াও বেশ কিছু দৃশ্য শ্রীপুরের বিভিন্ন স্থানে চিত্রায়ন করা হয়েছিল।

হিলভিউ পার্ক এন্ড ক্যাফে
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত চট্টগ্রাম তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাহাড়ি অঞ্চল এবং আকর্ষণীয় পর্যটন স্থানের জন্য বিখ্যাত। এরই এক অপূর্ব সংযোজন হলো হিলভিউ পার্ক এন্ড ক্যাফে (Hillview Park & Cafe), যা চট্টগ্রামের ভাটিয়ারীতে অবস্থিত। এটি একটি অনন্য দর্শনীয় স্থান যেখানে প্রকৃতির অপরূপ শোভা ও আধুনিক জীবনধারার ছোঁয়া একত্রে উপভোগ করা যায়। যারা প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে চান এবং একই সাথে স্বস্তিদায়ক পরিবেশে বিভিন্ন স্বাদের খাবার উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য এটি এক আদর্শ গন্তব্য।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জাদুঘর
পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থিত রাঙ্গামাটি শুধু লেক আর পাহাড়ের জন্যই নয় এখানকার বহুমাত্রিক সংস্কৃতির জন্যও বিশেষভাবে পরিচিত। এই বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিকে কাছ থেকে জানার সবচেয়ে সুন্দর জায়গাগুলোর একটি হলো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জাদুঘর (Museum of Ethnic Minorities), যা রাঙ্গামাটি-কাপ্তাই সড়কের আসামবস্তি এলাকায় অবস্থিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট (Cultural Institute of Minority Ethnic Groups)-এর অভ্যন্তরে।

মুপ্পোছড়া ঝর্ণা
মুপ্পোছড়া ঝর্ণা (Muppochora Jhorna) প্রস্থের দিক থেকে বাংলাদেশের অন্যতম বড় একটি ঝর্ণা। অনিন্দ্য সুন্দর মুপ্পোছড়া ঝর্ণা দেখতে হলে রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলার বাঙ্গালকাটায় যেতে হবে। কাপ্তাই লেক পাড়ের এই উপজেলা সাথে সড়ক পথে কোন সংযোগ নেই। কাপ্তাই উপজেলা হতে শুধুমাত্র নৌ-পথে এই উপজেলায় যাওয়া যায়। দূর্গম পার্বত্য এলাকা হওয়ায় এখানে অসংখ্য ছোট বড় পাহাড়ে আছে প্রচুর ঝর্ণা। চাকমা শব্দ বিলাই অর্থ বিড়াল এবং ছড়ি অর্থ পাহাড় হতে প্রাবাহিত ঝর্ণা। মুপ্পোছড়া ঝর্ণা বিলাইছড়িতে অবস্থিত বৃহত্তম ঝর্ণাগুলোর একটি। বিলাইছড়ি হতে শুধুমাত্র নৌপথে বাঙ্গালকাটাতে যাওয়া গেলেও বাঙ্গালকাটা হতে ট্রেকিং করে মুপ্পোছড়া ঝর্ণায় যেতে হয়।

কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের অবস্থান পটুয়াখালী (Patuakhali) জেলার কলাপাড়া থানার লতাচাপলি ইউনিয়নে। প্রায় ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত (Kuakata Sea Beach) থেকে একই সাথে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখা যায়। এই বৈশিষ্ট কুয়াকাটাকে সকল সমুদ্র সৈকত থেকে অনন্য করেছে। পরিচ্ছন্ন বেলাভূমি, অনিন্দ্য সুন্দর সমুদ্র সৈকত, দিগন্তজোড়া সুনীল আকাশ এবং ম্যানগ্রুভ বন কুয়াকাটাকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। পর্যটকদের কাছে কুয়াকাটা সাগরকন্যা হিসেবে পরিচিত।

পর্বত বাগান
১৯৩০ সালে রাস বিহারী পর্বত মাদারীপুর সদর উপজেলার মস্তফাপুর ইউনিয়নে কুমার নদীর তীরে দেশি-বিদেশি প্রায় ৫০০ প্রজাতির গাছের চারা রোপন করে একটি বাগান গড়ে তোলেন। প্রায় ২৬ একর জমির ওপর তৈরী বাগানকে তাঁর নামানুসারে পর্বত বাগান (Parbat Bagan) নামকরণ করা হয়। পর্বত বাগানের পাশ দিয়ে বয়ে চলা কুমার নদী চারপাশের পরিবেশকে করেছে আরো মোহনীয়। ফলে তৎকালীন সময়ে মাদারীপুর মহকুমার সকল উচ্চপদস্থ কর্মকতার অবাধ আগমন ঘটতো পর্বত বাগানে।

কালভৈরব মন্দির
ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলায় অবস্থিত কালভৈরব মন্দির (Sri Sri Kal Bhairab Temple) এক ঐতিহাসিক স্থাপনার নাম। তিতাস নদীর কূল ঘেঁষা ব্রাহ্মণবাড়ীয়া শহরের মেড্ডা এলাকায় ৩০০ বছরের পুরনো হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম এই তীর্থক্ষেত্রের অবস্থান। হিন্দু দেবতা শ্রী শ্রী কালভৈরবের মূর্তি এই মন্দিরের প্রধান আকর্ষণ। ১৯০৫ সালে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন ২৮ ফুট উচ্চতার কালভৈরব বা শিব মূর্তি ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বাধিক উচ্চতার মূর্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। বিশালাকার মূর্তির ডান দিকে কালী এবং বাম দিকে দেবী পার্বতীর প্রতিমা রয়েছে। সরাইলের বিখ্যাত জমিদার নূর মোহাম্মদ কালভৈরব মন্দিরের জমি দান করেন।

ছুটি রিসোর্ট
ছুটি রিসোর্ট ( Chuti Resort ) গাজীপুরের সুকুন্দি গ্রামে প্রায় ৫০ বিঘা জায়গার উপর যত্নে গড়ে তোলা হয়েছে। গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান সংলগ্ন গ্রামীণ আবহে তৈরী এই অবকাশ কেন্দ্রে রয়েছে নৌ ভ্রমণ এবং সংরক্ষিত বৃক্ষের বনে তাঁবু টানানোর ব্যবস্থা। এছাড়াও আছে ছনের তৈরী ঘর, কটেজ, মাছ ধরার ব্যবস্থা, বার্ড হাউস, ভেষজ গার্ডেন, ফল, সবজি ও ফুলের বাগান, আধুনিক রেস্টুরেন্ট, দুটি পিকনিক স্পট, গ্রামীণ পিঠার ব্যবস্থা, দুটি খেলার মাঠ এবং কিডস জোন। ছুটি রিসোর্টের পাখির কলরব, শিয়ালের হাঁক, বাঁদুড়, জোনাকি আলো ও ঝিঁঝিঁ পোকার গুঞ্জন আপনাকে প্রতি মূহুর্তে গাঁয়ের রাতের কথাই মনে করিয়ে দেবে। আর যদি কোন ভরা পূর্ণিমায় ছুটি রিসোর্টে আসেন তবে নিকষ কালো অন্ধকারে জোছনার পূর্ণ উপলব্ধি করতে পারবেন। কারণ পূর্ণিমা রাতে ছুটি রিসোর্টে কোন বিদ্যুতিক আলো জ্বালানো হয় না। শৈশবের দূরন্ত দিন, পূর্ণিমা এবং বর্ষা উপভোগ করতে চাইলে ছুটি রিসোর্টই হচ্ছে একটি আদর্শ স্থান। ছুটি রিসোর্টে আগত অথিতিদের নানা ধরনের মৌসুমি ফল উপহার দেওয়া হয়, আর সকালে নাস্তার আয়োজনে চালের রুটি, চিতই পিঠা, ডাল ভুনা, সবজি ও মুরগির গোশত পরিবেশন করা হয়।

শমসের গাজীর বাঁশের কেল্লা রিসোর্ট
ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলায় ভারত সীমান্তের কাছে গ্রাম বাংলার লোক সংস্কৃতির বিভিন্ন উপকরণের সমন্বয়ে শমসের গাজীর বাঁশের কেল্লা রিসোর্ট (Shamser Gazir Bansher Kella Resort) গড়ে তোলা হয়েছে। নবাব সিরাজদৌল্লার আমলে “ভাঁটির বাঘ” হিসেবে পরিচিত শমসের গাজী একাধারে ছিলেন ত্রিপুরা রাজ্যের রাজা, ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী এবং ত্রিপুরার রোশনাবাদ পরগণার কৃষক বিদ্রোহের নায়ক। সোনাপুরে শমসের গাজীর স্মৃতিচিহ্নকে কেন্দ্র করে তাঁর উত্তরসূরিরা প্রায় ৫ একর জায়গার উপর শৈল্পিক আয়োজনে এই রিসোর্টটি গড়ে নির্মাণ করেন।

নীলকুঠি ও ডিসি ইকোপার্ক
মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলার সাহারবাটি ইউনিয়নের ভাটপাড়ায় ঐতিহাসিক ভাটপাড়া নীলকুঠি ( Bhatpara Neelkuthi ) অবস্থিত। ১৮৫৯ সালে নির্মিত ভাটপাড়া নীলকুঠি তৈরীতে ইট, চুন-শুরকি, লোহার বীম এবং ইটের টালি ব্যবহার করা হয়েছে। কাজলা নদীর তীরে অবস্থিত ব্রিটিশ বেনিয়াদের নির্যাতনের সাক্ষী ভাটপাড়া নীলকুঠিরের দৈর্ঘ্য ৮০ ফুট এবং প্রস্থ ৭০ ফুট। কুঠিবাড়ির মূল ভবন ছাড়াও বর্বরতার ইতিহাস মনে করিয়ে দিতে আজো জরাজীর্ণ অবস্থায় টিকে আছে জেলখানা, মৃত্যুকূপ এবং ঘোড়ার আস্তাবল।