দর্শনীয় স্থান
বাংলাদেশের সেরা দর্শনীয় স্থানসমূহ আবিষ্কার করুন। প্রকৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অপূর্ব মিলনস্থল।

নিজাম হাসিনা মসজিদ
বাংলাদেশের একমাত্র দ্বীপ জেলা ভোলায় নির্মাণ করা হয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ অত্যাধুনিক মসজিদ নিজাম হাসিনা মসজিদ (Nizam Hasina Mosque)। ভোলা শহরের উকিল পাড়া নামক স্থানে প্রায় দেড় একর জমির উপর দ্বিতল এই মসজিদটি স্থাপন করেছে নিজাম-হাসিনা ফাউন্ডেশন। দৃষ্টিনন্দন কারুকাজ সম্বলিত অপূর্ব এই নিজাম হাসিনা মসজিদ নির্মাণে বিভিন্ন রঙয়ের মার্বেল পাথর ব্যবহার করা হয়েছে। নিজাম হাসিনা মসজিদে রয়েছে পুরুষ ও নারীদের জন্য পৃথক অজুখানা এবং নামাজের আদায়ের স্থান। এই মসজিদে প্রায় দুই হাজার মুসল্লির একত্রে নামায আদায়ের সুযোগ রয়েছে। ২০১০ সালের জুন মাসে মসজিদের ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করা হয় এবং ২০১৬ সালে ৩০ ডিসেম্বর রোজ শুক্রবার নিজাম হাসিনা মসজিদটি নিয়মিত নামায আদায়ের উদ্দেশ্যে উদ্বোধন করা হয়।

নর্থব্রুক হল
১৮৭৪ সালে ভারতের গভর্নর জেনারেল জর্জ ব্যরিং নর্থব্রুকের ঢাকা সফরকে স্মরণীয় করে রাখতে মোগল স্থাপত্যরীতি ও ইউরোপীয় কারুকাজের অপূর্ব সংমিশ্রণে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ফরাশগঞ্জ এলাকায় নর্থব্রুক হল (Northbrook Hall) নির্মাণ করা হয়। শুরুতে টাউন হল হিসাবে নর্থব্রুক হল নির্মাণ করা হলেও পরবর্তীতে একে গণগ্রন্থাগারের রূপ দিয়ে সাথে জনসন হল নামে একটি ক্লাব ঘর বানানো হয়। ভবনের রং লাল হওয়ার কারণে নির্মাণের পর থেকেই স্থানীয় লোকজনের কাছে নর্থব্রুক হল লালকুঠি নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৯২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নর্থব্রুক হলে সংবর্ধনা দেয়।

পাগলা দেওয়ান বধ্যভূমি
পাগলা দেওয়ান বধ্যভূমি (Pagla Dewan Boddhobhumi) ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জয়পুরহাট জেলার চকবরকত ইউনিয়নে সংঘটিত গণহত্যার এক ঐতিহাসিক নিদর্শন। জয়পুরহাট থেকে পাগলা দেওয়ান বধ্যভূমির দূরত্ব ১৭ কিলোমিটার। ১৯৭১ সালের মে মাসের শেষের দিকে পাকিস্থানি হানাদার বাহিনী ক্যাম্প ও বাঙ্কারসহ পাগলা দেওয়ানে ঘাঁটি গড়ে তুলে। সেসময় ভারতে আশ্রয় নেওয়ার উদ্দেশ্যে সীমান্ত দিয়ে গমনকারী বিভিন্ন এলাকার মানুষদের পাকিস্থানি বাহিনী ধরে লুটপাট ও হত্যা করে তাদের লাশ পাগলা দেওয়ান বধ্যভূমিতে পুঁতে রাখতো।

পানিহাটা-তারানি পাহাড়
শেরপুর জেলা শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে গারো পাহাড় সীমান্তবর্তী রামচন্দ্রকুড়া এলাকায় সারি সারি পাহাড় দিয়ে ঘেরা পানিহাটা ও তারানি গ্রামের অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত অঞ্চল পর্যটকদের কাছে পানিহাটা-তারানি পাহাড় (Panihata-Tarani Hill) হিসেবে সুপরিচিত। তারানি পাহাড়ের উত্তরে রয়েছে মেঘের আবছা আবরণে ঢাকা ভারতের তুরা পাহাড়। তুরা পাহাড়ের দূরের টিলাগুলো যেন মেঘের রাজ্যের সাথে মিতালি করে চারপাশে এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। তুরার অববাহিকা থেকে সামনের পশ্চিম দিকে বয়ে চলেছে পাহাড়ী ভোগাই নদী। এ নদীর স্বচ্ছ পানির নিচে রোদের আলোয় চিকচিক করা নুড়ি পাথর আর শত ফুট উঁচুতে থাকা সবুজে জড়ানো পাহাড় চারপাশে এক ভিন্নধর্মী সৌন্দর্যের আবহ তৈরি করেছে।

পরিকুন্ড জলপ্রপাত
মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলায় অবস্থিত পরিকুন্ড জলপ্রপাত (Parikunda Waterfall) অনেকের কাছেই অপরিচিত একটি নাম। অনন্য সুন্দর বিস্ময়কর এই জলপ্রপাত মাধবকুন্ড ঝর্ণা থেকে মাত্র ১০/১৫ মিনিটের পায়ে হাটা দূরত্বে অবস্থিত। গভীর বন ও প্রচারণার অভাবে ১৫০ ফুট উচু খাড়া পাহাড় হতে নেমে আসা পানির ধারা দেখতে খুব বেশি পর্যটকের চলাচল নেই। তবে অপ্রচলিত এই জলপ্রপাতের বুনো সৌন্দর্যের কোন কমতি নেই।

জলছত্র আনারস হাট
বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে আনারসের চাষ হলেও টাঙ্গাইল জেলার মধুপুরের উৎপাদিত আনারসের রয়েছে বিশেষ খ্যাতি। সমগ্র মধুপুর জুড়েই প্রচুর আনারসের চাষ হয়। আনারস কেনাবেচার জন্য মধুপুরের জলছত্র এলাকায় ঢাকা মহাসড়কের দুই পাশে প্রতি সপ্তাহের শুক্র ও মঙ্গলবার আনারসের বিশাল এক হাট বসে। প্রতিবছর বর্ষায় সারাদেশে যে আনারস পাওয়া যায় তার অধিকাংশই মধুপুর থেকে দেশজুড়ে ছড়িয়ে যায়। এদের মধ্যে মধুপুরের অরুনখোলা, ষোলাকুঁড়ি, আউশনাড়া ইউনিয়নে উৎপাদিত জলডুগি ও জায়ান্টকিউ আনারস সবচেয়ে জনপ্রিয়।

পলো বাইছ উৎসব
দলবেঁধে নদীতে মাছ ধরা গ্রাম বাংলার প্রাচীন এক ঐতিহ্য। শুষ্ক মৌসুমে অর্থাৎ প্রতি বছরের আশ্বিন মাস থেকে অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং এবং বিশ্বনাথ উপজেলার দেওকলস, দশঘর, দৌলতপুর, মাদাই প্রভৃতি বিল ও হাওরে পলো বাইছ উৎসব (Polo Bawa Utshob) আয়োজন করা হয়। বাঁশ দিয়ে তৈরি এক বিশেষ ধরণের ঝাঁপি বা মাছ ধরার ফাঁদকে “পলো” বলা হয়। গ্রামের মানুষ মাছ শিকার ছাড়াও বিভিন্ন দৈনন্দিন কাজে পলো ব্যবহার করে থাকেন। সারাবছর ধরে শৌখিন শিকারিরা পলো বাইছ উৎসবের জন্য অপেক্ষা করে থাকেন।

প্রতাপপুর জমিদার বাড়ি
প্রতাপপুর জমিদার বাড়ি (Pratappur Zamindar Bari) ফেনী জেলার দাগনভূঞা উপজেলার পূর্বচন্দ্রপুর ইউনিয়নের প্রতাপপুর গ্রামে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। তৎকালীন সময়ে অত্র অঞ্চলে প্রতাপপুর জমিদারদের অবস্থান ছিল সবার শীর্ষে। বিভিন্ন সূত্র হতে জানা যায়, ১৮৫০ মতান্তরে ১৮৬০ সালে জমিদার রাজকৃঞ্চ সাহা ৮০০ শতক জমির উপর দৃষ্টিনন্দন জমিদার বাড়ি নির্মাণ করেন। জমিদার রাজকৃঞ্চ সাহার পাঁচ সন্তান থাকতেন পাঁচটি দ্বিতল ভবনে। এই জমিদার বাড়িতে রয়েছে মোট ১৩টি মাছ চাষেড় পুকুর, আর বাড়ির বউদের জন্য ৫টি পুকুরে আছে শানবাঁধানো ঘাট। সেই সময়ে আশেপাশের অঞ্চলের জমিদাররা সফরবিরতিতে প্রতাপপুর জমিদার বাড়িতে অবস্থান করতেন। আর এই বাড়ি থেকেই অত্র এলাকার শাসনকার্য পরিচালনা করা হত।

রাজা টংকনাথের রাজবাড়ি
ঠাকুরগাঁও জেলার রানীশংকৈল উপজেলার কুলিক নদীর তীরে রাজা টংকনাথের রাজবাড়ি অবস্থিত। ঠাকুরগাঁও সদর হতে রাজা টংকনাথের রাজবাড়িটি (Raja Tonkonath’s Palace) ৪০ কিলোমিটার এবং রাণীশংকৈল উপজেলা হতে ১.৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। কথিত আছে, রাজা টংকনাথের পিতা বুদ্ধিনাথ চৌধুরী ছিলেন মৈথিলি ব্রাহ্মণ। তিনি কাতিহারে ঘোষ বা গোয়ালা বংশীয় জমিদারের শ্যামরাইয়ের মন্দিরের সেবায়েতে নিযুক্ত ছিলেন। নিঃসন্তান গোয়ালা জমিদার কাশীবাসে যাওয়ার আগে তাম্রপাতে দলিল করে জমিদারি সেবায়েতের তত্ত্বাবধানে রেখে যান। জমিদার আর ফিরে না আসায় দলিল মোতাবেক বুদ্ধিনাথ চৌধুরী জমিদারি লাভ করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্রায় ১০ একর জমির উপর বুদ্ধিনাথ চৌধুরী জমিদার বাড়ির নির্মাণ কাজ শুরু করলেও রাজা টংকনাথের হাতে নির্মাণ কাজ শেষ হয়।

রাজশাহী কলেজ
রাজশাহী কলেজ (Rajshahi College) বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যা ১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই কলেজটি দেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এর দীর্ঘ ইতিহাস, সমৃদ্ধ একাডেমিক পরিবেশ এবং গৌরবময় সাফল্য রাজশাহী কলেজকে দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে।

শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা
উত্তরাঞ্ছলের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ প্রান্তরে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সংগ্রহ নিয়ে গড়ে উঠেছে দেশের প্রথম শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা (RU Martyrs Memorial Museum)। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক জাদুঘর হিসেবে পরিচিত এই সংগ্রহশালায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও নানা স্মৃতি সংরক্ষিত আছে। তরুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত করতে ১৯৭৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার কমপ্লেক্সে এই সংগ্রহশালাটি যাত্রা শুরু করে। প্রতিদিন এখানে অসংখ্য দর্শনার্থী সংগ্রহশালায় আসেন।

রূপবান মুড়া
কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরে কোটবাড়িতে অবস্থিত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার নাম রূপবান মুড়া (Rupban Mura)। ৯০ দশকে কুমিল্লা-কালিবাজার সড়কের কাছে অবস্থিত বাংলাদেশের প্রাচীন ইতিহাসের এক অন্যতম এই নিদর্শনটি খনন করা হয়। কথিত আছে, রহিম ও রূপবানের ভালোবাসার এক অন্যতম নিদর্শন এই স্থান। তাদের অসম প্রেমের নানা ঘটনা ও কাহিনী রয়েছে সবুজ প্রকৃতির মাঝে গড়ে উঠা এই ঐতিহাসিক স্থানকে ঘিরে।

রেলওয়ে কারখানা ও জাদুঘর
বাংলাদেশের প্রাচীন শহরগুলোর মধ্যে নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর অন্যতম। ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য প্রসিদ্ধ হলেও বাংলাদেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানা (Railway Workshop) অবস্থিত হওয়ায় সৈয়দপুর অনেকের কাছে ‘রেলের শহর’ হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে। ১৮৭০ সালে প্রায় ১১০ একর জমির উপর নির্মিত এই রেলওয়ে কারখানায় নাট-বল্টু থেকে শুরু করে রেলওয়ের ব্রডগেজ ও মিটারগেজ লাইনের বগি মেরামতসহ সব ধরণের কাজ করা হয়।

সন্দ্বীপ
সন্দ্বীপ (Sandwip) বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে চট্টগ্রাম জেলার মেঘনা নদীর মোহনায় অবস্থিত দ্বীপ উপজেলা। প্রায় ৪ লাখ জনসংখ্যার এই দ্বীপ ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৫-১৫ কিলোমিটার প্রশস্ত। অবারিত সবুজ মাঠ, নদীর বুকে জেগে উঠা চর কিংবা সহজ সরল মানুষ এক কথায় এই দ্বীপের সবকিছুই ভালো লাগার মত। এছাড়াও দ্বীপে দেখার মত ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন স্থান রয়েছে। সাগর নদী পরিবেষ্টিত এই দ্বীপে ভ্রমণ সারা জীবন মনে রাখার মত। আর শীতের সময় ক্যাম্পিং করার জন্যে সন্দ্বীপের পশ্চিম দিকে (রহমতপুর) নদী পাড় হচ্ছে আদর্শ জায়গা। এখানকার চারপাশ আপনাকে মুগ্ধ করবেই।

সাতভাইখুম
বান্দরবান জেলায় অবস্থিত আমিয়াখুম জলপ্রপাত থেকে কিছুটা দূরে পাহাড় আর সবুজে ঘেরা স্বচ্ছ শীতল জলধারার নাম সাতভাইখুম (Satvaikhum)। বাঁশের ভেলায় করে সাতভাইখুমের জলপথ পাড়ি দিতে গেলে নিজেকে হঠাৎ যেন কোন পাথুরে দুর্গের অপ্রত্যাশিত আগন্তুক বলে মনে হতে পারে। চারপাশের সৌন্দর্য আপনি মুগ্ধ চোখে উপভোগ করবেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আকাশ ফুঁড়ে উপরে উঠে যাওয়া পাথরের পাহাড়, সবুজ প্রাকৃতির গাম্ভীর্য আর টলটলে সবুজাভ জলপথ যেন এখানে আগত দর্শনার্থীদের অলৌকিক সংবর্ধনা জানাতে ব্যস্ত। রুপ-সৌন্দর্য আর রোমাঞ্চকর অনুভবে সাতভাইখুম অতুলনীয়।

সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক বাড়ি
কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলা থেকে মাত্র ৭ কিলোমিটার দূরে মসুয়া গ্রামে অস্কার বিজয়ী চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক বাড়ি রয়েছে। এক সময় এই বাড়িটিকে ‘পূর্ব বাংলার জোড়াসাঁকো’ বলে অভিহিত করা হতো। এই বাড়িতেই প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক, সঙ্গীতজ্ঞ উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী ও সুকুমার রায় চৌধুরী জন্মেছেন। সত্যজিৎ রায় কোনোদিন পৈতৃক বাড়িতে না আসলেও পারিবারিক ঐতিহ্য তাকে গভীর ভাবে প্রভাবিত করেছে তাই বাংলাদেশের সঙ্গে ছিল তাঁর হৃদয়ের টান।